মো. নজরুল ইসলাম, ঝালকাঠি: একসময় ছিলেন বরগুনা জেলার বেতাগী পৌরশহরের নরসুন্দর (নাপিত) এখন সে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলা শহরের দন্ত চিকিৎসক। নামের আগে লেখেন ডাঃ কাঠালিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দক্ষিণ পাশের রোডে চেম্বার খুলে নিয়মিত চিকিৎসা দিচ্ছেন। এ দন্ত চিকিৎসকের নাম শিবানন্দ শিবু (শিবু শীল)। তার বাড়ী উপজেলার শৌলজালিয়া গ্রামে। কোন ডাক্তার না হয়েও নামের আগে ডাঃ লিখে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছেন তিনি। গ্রামের অসহায় ও সহজ-সরল মানুষের চিকিৎসার নামে অর্থ আত্মসাতসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এক স্কুল শিক্ষিকাকে ভুল চিকিৎসা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুল চিকিৎসার শিকার গুরুতর অসুস্থ ওই স্কুল শিক্ষিক এখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনা জেলার বেতাগী পৌরশহরে নরসুন্দরের কাজ করতেন শিবানন্দ শিবু। পরবর্তীতে দাঁতের চিকিৎসা লাভজনক হওয়ায় তিনি নরসুন্দরের পেশা ছেড়ে শুরু করেন দাতের চিকিৎসা। কোন ধরনের একাডেমিক, বিডিএস সনদ ছাড়াই শুরু করেন দন্ত চিকিৎসা। তার নামের পূর্বে “ডাঃ শিবানন্দ শিবু” ও ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল টেকনোলজি, ঢাকা। প্যাড, সাইন বোর্ড ও ব্যানার ব্যবহার করে চেম্বার সাজিয়ে দাঁতের চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে আসছেন। এতে রোগীরা তার কাছ থেকে রোগমুক্ত না হয়ে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন।
ভুল চিকিৎসার শিকার ভূক্তোভোগী স্কুল শিক্ষিক প্রতিভা রানী জানান, গত ২৯ এপ্রিল দাঁতে ক্যাপ বসানোর জন্য বিবেকানন্দ ডেন্টাল কেয়ারে ডাঃ শিবানন্দ শিবু’র কাছে যান ওই শিক্ষক। ডাঃ শিবু তার একটি দাতে ক্যাপ বসিয়ে দেন। কয়েকদিন পরে সেটা খুলে যায়। চেম্বারে গিয়ে বিষয়টি জানালে ডাঃ শিবু রোগীকে একটি ইনজেকশন পুশ করেন। কিছুক্ষণ পর দাঁতে সার্জারি করে প্রেসক্রিপশনে এ্যান্টিবায়েটিকসহ বিভিন্ন ওষুধ দিখে লিখে দেন। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার পরে মারত্মক অসুস্থ হয়ে পরেন শিক্ষক প্রতিবা রানী। এবং তার সমস্ত শরীরে জ্বালা-পোড়া শুরু হয়, চামড়া (ঠোসকা) উঠে যায়। রোগীর অবস্থার অবনতি হলে স্বজনরা তাকে ডাঃ দিলিপ চন্দ্র হাওলাদারের কাছে নিয়ে যায়।
তিনি জানান, ভুল ওষুধ ও ইনজেকশন পুশ করার জন্য এ অবস্থা হয়েছে। পরে অসুস্থ্য শিক্ষিকার পরিবার খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন শিবু কোন ডাক্তারই না। অথচ নামের আগে ডাঃ লিখে মানুষের সাথে প্রতারণা করছেন তিনি।
ভুূক্তভোগী ওই শিক্ষিকার স্বামী মিলন সিকদার বলেন, আমার স্ত্রী বিবেকানন্দ ডেন্টাল কেয়ারে শিবানন্দ শিবু চেম্বারে যায় তার একটি দাঁতে ক্যাপ বসানোর জন্য। কিন্তু ক্যাপ বসানোর নামে তার দাঁতে কয়েকটি সার্জারি করেন শিবানন্দ শিবু। এতে তার দাঁতে প্রচন্ড ব্যাথা হয়। পরে পুনরায় তার কাছে গেলে রোগীর শরীরে একটি ইনজেকশন পুস করে এবং প্রেসক্রিপশনে বিভিন্ন রকেমের ওষুধ লিখে দেন। বাসায় আসার পরে আমার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সমস্ত গায়ে জ্বালা যন্ত্রণাসহ কালো কালো ঠোসকা উঠে যায়। এরপর তাকে একজন এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জানান উল্টা পাল্টা ওষুধের কারণে তার এরকমের হয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পাড়ি শিবু কোন ডাক্তারই নয়। তিনি মূলত একজন নাপিত (নরসুন্দর) ছিলেন। কিভাবে তিনি ডাক্তার হলেন তা আমার ভোদগম্য নয়। এই ভূয়া ডাক্তারের কঠোর বিচার দাবী জানান তিনি।
শিবানন্দ শিবু বড় ভাই বাবুল চন্দ্র শীল জানান, তিন ভাইদের মধ্যে শিবু শীল সবার ছোট। শিবুকে তিন বছরের রেখে মারা যায় তার মা। এরপর কোলে পিঠে করে মানুষ করেন তিনি। স্থানীয় শৌলজালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ৩/৪ বার এসএসসি পরীক্ষা দেয় শিবু। সব বারই পরীক্ষা ফেল করে সে। পরে বেতাগী বন্দরে একটি সেলুনে ৫/৭ বছর কাজ করে শিবু।
তিনি আরও জানান, শিবু কোথাও ডাক্তারি পড়ে নাই। বেতাগী বন্দরের শিবুর সেলুনের পাশে আলম ডেন্টাল কেয়ার নামে একটি দোকান ছিল, অবসরে সেখানে গিয়ে বসতো এবং তাদের কাজ দেখতো। এখন কাঠালিয়ায় চেম্বার খুলে নিজেই রোগী দেখেন।
শিবানন্দ শিবুর বাল্যবন্ধু ও সহপাঠী মো. ওবায়দুর রহমান, আব্দুল কাদের ও এনায়েত জানান, ১৯৯১ সনে শৌলজালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে আমাদের সাথে শিবু এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একাধিক বিষয়ে ফেল করে। এরপর ৩/৪ বার পরীক্ষা দিয়েও পাশ করতে পারেনি। এমনকি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কোন ক্লাসেই সে ২/৩ বিষয়ের বেশি পাশ করতো না। শিবু এখন দাঁতের ডাক্তার শুনে আমরা খুবই আশ্চর্য হই।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, প্রতিদিন এ ধরনের ঘটনা শিবু ডাক্তারের চেম্বারে ঘটে। রোগীরা বিভিন্ন সময় স্থানীয় লোকদের নিকট বিচার দেয়। প্রায়ই রোগীদের জরিমানা দেয় শিবু ডাক্তার। এছাড়া তার চরিত্র ও ভালো না।
এ বিষয়ে বিবেকানন্দ ডেন্টাল কেয়ারের স্বত্বাধিকারী শিবানন্দ শিবু বলেন, স্কুল শিক্ষিক প্রতিভা রানী দাঁতের সমস্যার জন্য আমার চেম্বারে আসেন। তার দাঁতের চিকিৎসা (রুট ক্যানেল) শুরু করি এবং পাঁচ দিনের এন্টিবাায়োটিক দেই। ৬ দিন পর তিনি আবার আসেন। রুট ক্যানেল করলেতো ৪/৫ বার আসা লাগে জানিয়ে ওষুধে কোন সমস্যা নেই। এরপরও যদি জ্বর হয় তাহলে একটা নাপা র্যাপিড খাওয়ার পরামর্শ ডাঃ শিবু। অবস ও ব্যাথা কমানোর জন্য লোকাল ও টোরাক ইনজেকশন দাঁত তুলে দেয়। ব্যাথার সময় কিছু করা যায় না। তিনি আরও জানান, মূলত “ড্রাগ রিঅ্যাকশন” হয়েছে। নামের পূর্বে ডাঃ লেখার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওটা আমি লিখি নাই, কোম্পানীর লোকেরা প্যাড তৈরি করে দিয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ তাপস কুমার তালুকদার বলেন, কোন বিডিএস ডিগ্রী অর্জন ছাড়া ডাঃ লিখতে পারবেন না। সাধারণ রোগীদের সচেতন হওয়াসহ হাতুরে ডাক্তারের কাছে না যাওয়ার পরামর্শ দেন এ কর্মকর্তা।
ঝালকাঠি সিভিল সার্জন ডাঃ এইচ এম জহিরুল ইসলাম বলেন, ভূক্তোভোগীরা আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয় হবে।
এসএইচ
