সাইফুল ইসলাম মুকুল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, রংপুর: রংপুর নগরীতে কাদা পানির মাঝে প্রতিদিন কোটি টাকার মাছের ব্যবসা হয়। আড়ত প্রতিষ্ঠার ৩৩ বছরেও এখানে লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই।
ময়লা পানিতে ভরে থাকে পুরো আড়ত। আর সেখানেই পানি মাড়িয়ে চলছে মাছের কেনাবেচা। আড়তে ঢুকে মাছ কিনে পরিষ্কার পোশাক ও জুতা নিয়ে বের হওয়ার যেন উপায় নেই। আড়তদারদের মাছ বিক্রির নেই কোনো ঘর। রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে মাছ বিক্রি করতে হয়।
আড়তের সামনে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই, তাই মাছ পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক, ভ্যান, রিকশা ও অটোরিকশার জন্য রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বাজারের কাছে নেই কোনো টয়লেট ও খাওয়ার পানির ব্যবস্থা।
মৎস্য আড়ত সমিতির দাবি, ইজারা প্রদান করা হলেও উন্নয়ন হচ্ছে না মাছের আড়তের। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের দাবি, আড়ত সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও আড়ত সমিতির স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট সংস্কারে বাধা প্রদান করছে।
মৎস্য আড়ত সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯০ সালে রংপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের পাশে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের কাছে রংপুর সিটি করপোরেশনের ৫৪ শতক এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গড়ে উঠে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মৎস্য আড়তটি।
এখানে প্রতিদিন চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, বগুড়া, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে করে কার্প, দেশি প্রজাতিসহ সামদ্রিক মাছ আসে। এখান থেকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার ব্যবসায়ীরা মাছ কিনে নিয়ে যান। এ আড়তে ৪০ থেকে ৪৫ জন আড়তদার প্রতিদিন দেশীয় কার্পজাতীয় মাছ বিক্রি করেন।
সামুদ্রিক মাছের আড়ত রয়েছে ২০টির অধিক। প্রতি আড়তে ব্যবসা হয় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার। আর দেশি মাছের আড়তদাররা প্রত্যেকে প্রতিদিন ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেন। এই আড়ত থেকে ব্যবসায়ীরা পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা মাছ কিনে নিয়ে যান।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে মাছের বেচাকেনা। রংপুর মৎস্য আড়তে রুই, কাতলা, মৃগেল, কার্ফু, পাঙাশ, সরপুঁটি, তেলাপিয়া, বোয়াল, সিলভার কার্প, চিতল, মাগুর, ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ এবং চাপিলাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ উঠছে। আড়তে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাছের ব্যবসা হলেও এখানে উন্নয়নের কোনো বালাই নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুর নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের পাশে অবস্থিত মৎস্য আড়তটি। বরফ গলা ও মাছ রাখা পানিতে চারদিক কাদায় পরিপূর্ণ। কোনো রকম কাদা মাড়িয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় কাদা পানিতে একাকার আড়ত। ব্যবসার জন্য আড়তে আসা ক্রেতাদের বেশিরভাগ লুঙ্গি তুলেছেন হাঁটুর ওপরে।
আড়তে মাছ কিনতে আসা ক্রেতাদেরও হাঁটুর ওপরে প্যান্ট গুটিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। এরই মাঝে আড়তদাররা মাছ উঁচিয়ে ধরে ক্রেতাদের ডাকছেন। আড়তে রুই মাছ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, নাটোরসহ অন্যান্য জায়গা থেকে রুই মাছ এসেছে।
প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ কেজি মাছ বিক্রি করি। কিন্তু এখানে মাছের ব্যবসা করার মতো পরিবেশ নেই। মাছ বিক্রির জন্য ঘর নেই, আড়তে চলাচলের রাস্তা নেই, পানি সরে যাওয়ার জন্য ড্রেন নেই, এমনকি টয়লেটও নেই। পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় ময়লা পানির মাঝে আমাদের দাঁড়িয়ে মাছ বিক্রি করতে হয়। সারা দিন পানি জমে থাকার কারণে পায়ে ঘা হয়ে গেছে।
আড়তে কর্মরত মনির হোসেন বলেন, আড়তের সামনে যখন মাছের ট্রাক আসে কিংবা সকালে যখন রিকশা থেকে অটোরিকশায় করে মাছ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন যানজটের কারণে মহাসড়কে গাড়ি চলাচলের সমস্যা হয়। এ ছাড়া মাছ বিক্রির ঘর না থাকায় রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে আমাদের অনেক কষ্ট পোহাতে হয়।
মাছ বিক্রেতা সামসুল আলম বলেন, পুরুষ মানুষ ভিড় ও কাদা পানি মাড়িয়ে আসতে পারলেও মহিলারা আড়তে আসতে পারেন না। আড়তে মাছ হিমায়িত করে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে পার্শ্ববর্তী একটি ঘর ভাড়া করে মাছ সংরক্ষণ করতে হয়। আড়তে রংপুর সিটি করপোরেশনের জায়গা কম হওয়ায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে ব্যবসা করা আড়তদারদের ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, ইতঃপূর্বে জাইকার অর্থায়নে পার্শ্ববর্তী কৃষি বিপণনের একটি মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে মাছের আড়তটি স্থানান্তর করার চেষ্টা করেছিল সিটি করপোরেশন। কিন্তু আড়তের শীর্ষনেতারা কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সেটিতে আগ্রহ দেখাননি।
জেলা মৎস্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মিজানুর রহমান মিজু বলেন, সিটি করপোরেশনকে ইজারা বাবদ প্রতি ৬ মাসের জন্য ১২ লাখ টাকা দেয়া হয়। প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি টাকার মাছ বিক্রি হলেও এই মৎস্য আড়তটি দীর্ঘদিন থেকে উন্নয়নবঞ্চিত।
মৎস্য আড়তের উন্নয়নে সম্প্রতি একটি প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। আশা করছি সেটি পাস হলে আড়তের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে।
এ নিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রংপুর মৎস্য আড়তের বেহাল অবস্থা। সেখানকার আড়তদার ও ক্রেতারা কাদা পানির মাঝে অনেক কষ্ট করে মাছ কেনাবেচা করেন।
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আড়তটি সংস্কারের জন্য এর আগে আড়ত সমিতিকে তিন মাসের জন্য অন্যত্র আড়ত স্থানান্তর করতে বলা হলেও সমিতি সেটি আমলে নেয়নি। ফলে মৎস্য আড়ত সমিতির কারণে সেখানে দুর্ভোগ বেড়েছে।
তবে এ থেকে উত্তরণে মৎস্য আড়তের উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি, সেটির কাজ দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে।
এআই
