পাবনার ৮৬ বছর বয়সী আকাশ কলি দাস আর তার বোন ৬১ বছর বয়সী ঝর্ণা দাস। দুজন মিলে একসঙ্গে থাকেন ৬ বিঘা জমিতে দুইশ বছরের পুরনো মাটির ঘরে। প্রকৃতির মধ্যে থেকেই জীবন পার করে দিয়েছেন এই ভাইবোন। বিয়ে করেননি দুজনের কেউই। আত্মীয়-স্বজন বলতে প্রায় কেউই নেই তাদের। যারা আছেন, তারাও সীমান্তের ওপারে; স্বাধীনতার আগে চলে গেছেন ভারতে।
বাবা মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে বড় আকাশ কলি দাস। বাবা চন্দ্র কুমার দাস ছিলেন পাবনার নগরবাড়ির শ্রী নিবাস দিয়ার জমিদার বাড়ির নায়েব। মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পরে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। হারিয়ে যায় তার কৈশোর। অভিভাবকের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দুই বোন ও এক ভাইয়ের বিয়ে দেন প্রতিবেশী দেশ ভারতে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর তারা আর যোগাযোগ করেননি ভাইয়ের সঙ্গে। তিন ভাই বোন তাকে ভুলে গেলেও তার সঙ্গ ছাড়েননি বোন ঝর্ণা দাস। ভাইয়ের সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়েছেন তিনি।
বেড়া উপজেলার কৈটোলা গ্রামে বসবাস করেন তারা। দুই ভাই বোনের কেউই বিয়ে করেননি। তারা দুইজন ছাড়া সব আত্মীয়-স্বজনই চলে গেছেন ভারতের শিলিগুড়ি ও মুর্শিদাবাদে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাড়ে ৬ বিঘা জমির ওপর দুইশ বছর পুরনো মাটির চার চালা ঘরে বসবাস করেন দুই ভাই বোন। আরেকটি ছোট দোচালা ঘরে চলে ভাই-বোনের রান্নাসহ আনুষঙ্গিক কাজ। পাশে দুইটি গোয়াল ঘরও রয়েছে। বাড়ির আশেপাশে শুনশান নীরবতা। তবে কোলাহলমুক্ত পরিবেশ পাখির কলতানে মুখর হয়ে আছে। ঝোপ-জঙ্গলে দেখা মেলে অচেনা পাখিদের। কুকুর-শিয়াল-সরীসৃপও দেখা যায়। আছে অতিথি পাখি। এরকম এক গা ছমছমে পরিবেশে বাস করেন আকাশ ও ঝর্ণা।
প্রতিবেশীরা জানান, মাঝে মাঝে আকাশের দেখা পাওয়া গেলেও কখনো বাইরে আসেন না ঝর্ণা।
বসতভিটায় সাড়ে ৬ বিঘার সম্পত্তির পাশাপাশি মাঠেও রয়েছে অর্ধশত বিঘা জমি। এমন অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও দুইজনের জীবনযাপন সাদা-মাটা। বাড়িতে তারা দুইজন ছাড়া আর কেউ নেই। সম্পত্তি নিয়ে তাদের কোনও চিন্তা বা মোহ নেই।
গরু ও মাঠের কাজে জন্য রাখাল ও শ্রমিক আছে। তবে তারা কাজ শেষে যে যার বাড়িতে চলে যান।
আকাশ কলি দাসের দাবি- ঠিক কী কারণে তিনি বিয়ে করেননি তা তিনি জানেন না। আর বোন কী কারণে বিয়ে করেননি তাও জানে না তিনি! তবে সংসার জীবন পছন্দ হলেও ভাই-বোনদের বিয়ে ও দায়িত্ব নেওয়ার কারণে বিয়ে করা হয়নি বলে জানান তিনি।
তবে বোন ঝর্ণাকে প্রথমে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে রাজি না হওয়ায় তাকেও আর বিয়ে দেননি। নিরিবিলি জীবন কাটাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। চির কুমার-কুমারী হিসেবেই জীবন কাটিয়ে দিলেন তারা।
৬১ বছর বয়সী ঝর্ণা দাস বেশির ভাগ সময় বই পড়ে সময় কাটান। ভাই আকাশ কলি দাস বইয়ের পাশাপাশি পশু-পাখি ও প্রকৃতির মাঝে সময় কাটান। তার একাকিত্বের কিছু সময় লাঘব করেন এই পশু-পাখি ও প্রকৃতি। কাণ্ডারিবিহীন নৌকার মতো কাটিয়েই পার করতে চান তারা।
ভাই-বোনের পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাও সবাইকে মুগ্ধ করেছে। সাড়ে ৬ বিঘার বসতভিটার পুরোটাই পাখিদের জন্য তিনি মুক্ত করে দিয়েছেন। জায়গাটি সরকারের পক্ষ থেকে পাখির অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।
আকাশ দাস আগলে রেখেছেন শত বছরের পুরনো একটা লতা গাছ। তিনি বলেন, গাছটির নাম কেউ জানেন না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের প্রফেসর মনিরুল ইসলাম খান এসেছিলেন এই গাছ দেখতে। তিনিও সেই গাছের নাম দিতে পারেননি। এছাড়াও জার্মানি ও লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকরা এসেছিলেন গাছটি দেখতে কিন্তু তারাও এই গাছটির নাম জানাতে পারেননি।
ভাইবোন ভারতে পাড়ি দিলেও, দেশের ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার জন্য তিনি দেশ ছাড়েননি। ভাইবোনদের অনুরোধেও কখনও ভারতে যাওয়া হয়নি তার। ফলে ভাইবোনদের মধ্যে ৫০-৬০ বছর ধরে কোনও দেখা হয়নি। আশপাশের মানুষের বিপদের কথা শুনলেও ছুটে যান তিনি। টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্যের চেষ্টা করেন। অসহায় কেউ তার কাছে গেলে খালি হাতে ফেরান না। একারণে অর্ধশতাধিক বিঘার সম্পত্তির মালিক হয়েও ঋণের বোঝা রয়েছে তার।
একসময় গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করলেও অবসর নিয়েছেন অনেক আগেই। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার পর আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে রাজনীতি করলেও এক সময় রাজনীতি থেকেও বেরিয়ে আসেন তিনি। পাবনা ও দেশের রাজনীতির অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের সাক্ষীও তিনি।
এ বিষয়ে কৈটোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহসিন উদ্দিন পিপল বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত দানশীল মানুষ। উনার দানে অনেক ছেলে-মেয়ে শিক্ষিত হয়েছেন। আমাদের এলাকার অনেক কিছুতেই তার অবদান রয়েছে।’
বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহা. সবুর আলী বলেন, ‘আমি তার বিষয়ে কিছু জানি না। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। আমি অবশ্যই তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিবো। তারপর আমি বিষয়টি সম্পর্কে ও আমাদের করণীয় নিয়ে আপনাকে বলতে পারবো।’
