নজর২৪ ডেস্ক- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুকির বর্তমান অবস্থা দেখে তার পাশে দাঁড়িয়েছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এরই মধ্যে রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আবদুল জলিল তার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তার বাড়ি পরিদর্শন করেছেন।
এর আগে তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে রাজশাহীর পবা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ এহসান উদ্দীনের মনে তা নাড়া দেয়। এরপর তিনি খুকির বাড়িতে যান। তার সঙ্গে কথা বলেন এবং খোঁজ-খবর নেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ এহসান উদ্দীন জানান, তাকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসক পত্রিকা বিক্রেতা খুকির বাসায় যান। এরপর তারা খুকির সঙ্গে কথা বলেন এবং তাকে দেখভালের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব নেওয়া হবে বলে জানান।
এ সময় খুকি রাজশাহী জেলা প্রশাসককে জানান, তার বাবা রাজশাহী জেলা আনসার অ্যাডজুটেন্ট ছিলেন। তার মা ছিলেন সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষিকা।
অল্প বয়সে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সবাই তাকে ঠকিয়েছে। চরম দুর্দিনেও কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি। এজন্যই তিনি পত্রিকা বিক্রি করে অনেক কষ্টে খেয়ে না খেয়ে জীবন-যাপন করেন। তার নিজস্ব বাড়ি আছে। পৈত্রিকভাবে তারা স্বচ্ছল ছিলেন। কিন্তু কিছুটা মানসিক সমস্যা হওয়ায় নিজের ভাই-বোনও তাকে দেখেন না।
শেখ এহসান উদ্দীন বলেন, খুকির জমি আছে। বাড়ি আছে। তবে তা বসবাস উপযোগী করা প্রয়োজন। তার সেবা-যত্ন বেশি প্রয়োজন। কারণ তিনি একা থাকেন।
এখন রাজশাহী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বাড়িটি বসবাস উপযোগী করে দেওয়া হবে। যদিও এরই মধ্যে অনেকেই খুকির পাশে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। এর পরও রাজশাহী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুকিকে প্রতি মাসের বাজার খরচ দেওয়া হবে। পাশাপাশি তাকে দেখভালের জন্য ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান সহকারী কমিশনার।
ডিসি মো. আবদুল জলিল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা খুকির পাশে আছি। তাকে দেখভালের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। মূলত তিনিই খুকিকে দেখভালের জন্য বলেছেন। তিনি নিজেই খুকির দায়িত্ব নিয়েছেন।
এদিকে, রাজশাহী শহরের একমাত্র নারী পত্রিকা বিক্রেতা তিনি। ৪০ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি জীবিকা নির্বাহ করছেন। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ১১ বছর আগের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে পত্রিকার এজেন্ট ও স্থানীয় পত্রিকার সার্কুলেশন থেকে পত্রিকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন নগরীতে। খুকির হাতের পত্রিকা পড়ে তারা, খুকির জীবনের গল্প পড়া হয়ে ওঠে না। রাজশাহী নগরীর বিভিন্নপ্রান্তে ৪০ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করেন দিল আফরোজ খুকি। খুকিরও গল্প আছে। সে গল্প জানা হয়ে ওঠে না কারো, খুকির ভাইরাল ভিডিও দেখে অনেকেই কাঁদেন, ফেসবুকে শেয়ার দেন কিংবা জানতে চান খুকির বর্তমান অবস্থা।
খুকির জীবনে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে বিয়ের মাত্র ১ মাসের মাথায়। স্বামী মারা যান, বিধবা হন একমাসের মাথায়। উত্তরাঞ্চলের শহরে বিয়ে হলেও সামাজিক রীতি তো আর সামাজিকতা ভেঙে বেরিয়ে পড়েনি। তবুও সেই শহরে খুকি উঠে দাঁড়ালেন। তবে উঠে দাঁড়ানোর গল্পটা সহজ নয়। নিজ পরিবার থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। একসময় ঠিকানা হয় পথ। এর মাঝে হয়তো অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। শোনা যায়, বাবা-মা, ভাই-বোনের অবহেলিত সেই নারী ঘর-বাড়ি ছাড়া রাস্তায় পড়েছিলেন। তবুও ভিক্ষের পথ বেছে নেননি। একদিন রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগ উপযুক্ত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্মানি হিসেবে ১৫০ টাকা পান। আর এই ১৫০ টাকা দিয়ে শুরু করেন নিজের উঠে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা। শুরু করলেন পত্রিকা বিক্রি।
জানা গেছে, কিশোরী বয়সে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধের সঙ্গে খুকির বিয়ে হয়েছিল। মাস যেতে না যেতেই স্বামী মারা যান। ১৯৮০ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবার, আত্মীয়-স্বজন তাকে ঘরছাড়া করেন। ভাইদের আপত্তিতে বাবার বাড়িতে তার জায়গা হয়নি। এরপর থেকেই কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি।
খবরের কাগজ বিক্রি করে একসময় প্রতিদিন ৩০০ টাকা আয় করতেন। এই আয় থেকে নিজের জন্য ব্যয় করতেন মাত্র ৪০ টাকা। হজে যাওয়ার তীব্র বাসনায় ১০০ টাকা ব্যাংকে জমা করতেন। আর ১৬০ টাকাই ব্যয় করতেন মানুষের সেবামূলক কাজে। এর মধ্যে ১০০ টাকা দিতেন এতিমখানায়, ৫০ টাকা দিতেন মসজিদ-মন্দিরে আর ১০ টাকা দিতেন ফকির-মিসকিনকে।
এতদিনে ব্যাংকে জমা হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। সেই জমানো অর্থ আর পৈতৃকভাবে পাওয়া কিছু সম্পত্তিই তার জীবনের শেষ সম্বল। যা দিয়ে যেতে চান কোনো স্কুলের নামে। সেই দানের টাকা থেকে গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে বৃত্তি। মৃত্যুর পর তার লাশটা যেন জন্ম শহর কুষ্টিয়ায় দাফন করা হয়, সে ইচ্ছাই তিনি জানিয়েছেন। খুকির সময়টা এখন ভালো কাটছে না। কাটছে নানা দুঃখ-কষ্টে। প্রায় ৪০ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রির সঙ্গে জড়িত খুকি।
প্রতিদিন সকালে তার শিরোইল মহল্লার বাসা থেকে বের হয়ে হেঁটে রাজশাহী মহানগরীর রেলগেট মার্কেটে পত্রিকার এজেন্টদের কাছ থেকে পত্রিকা কেনেন। তারপর সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে রাজশাহীর রেলস্টেশন, আরডিএ মার্কেট, সাহেববাজার, সাগরপাড়া, শিরোইল বাস টার্মিনাল, আলুপট্টি ও নিউমার্কেট এলাকায় পত্রিকা বিক্রি করেন। এসব স্থানে তার কিছু নিয়মিত গ্রাহক আছে। এ ছাড়াও হেঁটে হেঁটে পত্রিকা বিক্রি করেন, কারো কাছ থেকে বাড়তি পয়সা পেলেও নেন না।
খুকির নানামুখী সমস্যা থাকলেও থাকেন নিজের বাড়িতে। বড় বোনের বাসা খুকির বাড়ির পাশেই। বড় বোনের ছেলে শামস-উর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘খালাকে আমরা পত্রিকা বিক্রি করতে নিষেধ করেছি। তিনি আমাদের কথা শোনেন না। তিনি পত্রিকা বিক্রি করে একা একাই চলতে চান।’
খুকি সম্পর্কে প্রতিবেশীরা বলছেন, তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। নিঃসন্তান নারীর বিয়ে হয় কিশোরী বয়সে। এক মাসের মাথায় স্বামী মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিনি একগুয়ে স্বভাবের হয়ে ওঠেন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া জমিতে বাড়ি তৈরি করে একাই থাকেন। কারও কাছ থেকে কোনো সহায়তা নেন না। পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
অথচ ১১ বছর আগের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে খুকির শেষদিকের কথাগুলো ছিল, ‘কেউ আমাকে এক পয়সার হেল্প করেনি। কী হবে এই সাক্ষাৎকার নিয়ে? কেউ তো আমাকে সাহায্য করবে না।’
খুকি যাদের কাছ থেকে পত্রিকা নেন; তাদেরই একজন লিটন ইসলাম বাবু। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, খুকি আপা আমার কাছ থেকে ১৩ বছর ধরে পত্রিকা নেন। কখনোই টাকা বাকি রাখেন না। টাকা-পয়সার বিষয়ে খুকি আপা সচেতন। শোধ করে তারপরে পত্রিকা নেন। তবে খুকির বর্তমান অবস্থা যে শোচনীয়, তা সার্কুলেশন ম্যানেজার বাবুর কথাতেই বোঝা গেল। কেননা আগে ১৫০ কপি পত্রিকা কিনলেও এখন কেনেন ৩০-৪০ কপি। অর্থাৎ খুকির আয়ের উৎস তলানিতে ঠেকেছে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
