রাজিব মজুমদার, মীরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: কনকনে শীতের সন্ধ্যায় ঐতিহ্যবাহী ভাপা পিঠার গন্ধে মুখর মীরসরাইয়ের বিভিন্ন হাটবাজার। ভ্রাম্যমান মৌসুমী পিঠা দোকানীরা সন্ধ্যার শুরুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ভাপা পিঠা তৈরিতে।
আধুনিক গৃহবধূরা বিভিন্ন পিঠা তৈরীতে অনাভ্যস্ত হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী শীতের পিঠার মতো বাঙালীর সংস্কৃতির ভোজনের এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে এই ঘাটতি পূরণ করছে ভ্রাম্যমান মৌসুমী পিঠা দোকানীরা। শীতের তীব্রতা যতই বাড়ছে ভাপা পিঠার চাহিদা ততই বাড়ছে।
মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ বাজার এলাকায় ছোট্ট একটা ভ্রাম্যমাণ দোকান। শীতের সন্ধ্যায় সেখানে পিঠা খেতে ভিড় জমিয়েছেন কয়েকজন তরুণ ও বৃদ্ধ। দোকানের পাশে জ্বলছে চুলা। চুলাটিতে ভাপা পিঠা তৈরির পাতিল বসানো। পিঠা তৈরির ছাঁচে চালের গুঁড়ি নিয়ে তার ওপর গুড়, নারিকেল ছিটিয়ে দিয়ে ভাপে দিচ্ছিলেন দোকানি কিতাব আলী। তৈরি হতেই গরম গরম ধোঁয়া ওঠা পিঠা উঠে যাচ্ছিল হাতে হাতে। ফাস্টফুড সংস্কৃতির এই যুগেও শীতের বাঙালীর সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গরম পিঠার জনপ্রিয়তা দিন দিনই বেড়েই চলেছে।
শীত এলেই বাঙালির মনে আসে শীতের পিঠার কথা। পিঠা ছাড়া বাংলার শীত পরিপূর্ণ হয় না। শীতে পিঠা খাওয়ার রীতি বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ। মীরসরাইয়ের বারইয়ারহাট, জোরারগঞ্জ, আবুরহাট, মিঠাছরা, মীরসরাই, বড়তাকিয়া, আবুতোরাব, করেরহাট, আবুরহাট, শান্তিরহাট, বড় দারোগারহাটসহ বিভিন্ন হাটবাজার ভরে উঠছে ভাপা পিঠার মৌ মৌ গন্ধে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই খাবার উপভোগ করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না অনেকে। এসব দোকানে পাঁচ টাকায় চিতই ও পাঁচ থেকে ১০ টাকায় ভাপা পিঠা পাওয়া যায়।
জোরারগঞ্জ বাজারের পিঠা দোকানি কিতাব আলী জানান, গত ৮ বছর ধরে তিনি ভাপা পিঠা তৈরি করছেন। সাংসারিক কাজের পাশাপাশি তিনি এ পেশা ধরে রেখেছেন। সীমিত খরচে ভালো লাভের আশায় প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পিঠা বিক্রি করেন। দিনে ৮০০ টাকা খরচ করে তিনি প্রায় ৪০০ টাকা লাভ করেন। এ ব্যবসা করে তিনি মোটামুটি ভালোভাবে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরেক পিঠা দোকানী কামাল উদ্দিন বলেন, ‘অভাবের সংসারে শীতের দিনে বাজারে পিঠা বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়। প্রতিদিন প্রায় ৪শ’ থেকে ৫শ’ টি পিঠা বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে দিনে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা আয় হয়। ভাপা পিঠা তৈরিতে খরচ ও সময় দুটোই কম লাগে। তাই অল্প পুঁজি ও অল্প সময়ে বেশি আয় হয় বলে পিঠা তৈরিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি।’ ভোজনরসিকদের মধ্যেও শীতের পিঠা নিয়ে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই।
জোরারগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী বাবুল সেন বলেন, ‘সময় কিংবা ব্যস্ততার কারণে বাড়িতে প্রায়শই পিঠা বানানো রীতি উঠে যাচ্ছে। তাই শীতের পিঠা খাওয়ার সাধ মেটাতে ভ্রাম্যমান দোকানী থেকে পিঠা কিনে খেতে হয়। স্বাদ-গন্ধে বাড়ির মতো না হলেও ভালো লাগে।’
ছোট বেলায় ভাপা পিঠা খাওয়ার মধুর স্মৃতি মনে করতে গিয়ে আরেক ভোজন রসিক সজল চন্দ্র নাথ বলেন, ছোট বেলায় মায়ের হাতের ভাপা পিঠা খাওয়ার স্বাদ দোকানে পাওয়া যায় না। তবে এখন সন্ধ্যায় ভাপা পিঠার গন্ধে মুখর বিভিন্ন বাজার। তাই সেই স্বাদ না পেলেও গন্ধ কিন্তু মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
