নজর২৪ ডেস্ক- সম্প্রতি অভিনেত্রী ও কথিত মডেলকে গ্রেফতারের পর মুখোশ খুলছে ‘রাতের রাজাদের’। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারকৃতদের বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার ও ইন্ধন জোগানোর পাশাপাশি মাদক, চোরাচালান ও অস্ত্র কারবারেও সহযোগিতা করার তথ্য মিলছে। খবর- মানবকন্ঠের
পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রাতের রানী’খ্যাত বিতর্কিত চলচ্চিত্র নায়িকা পরীমণি ও কথিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা-মৌ, প্রযোজক রাজ, গাড়ি চোরাচালান ও অস্ত্র কারবারে জড়িত মিশু হাসান এবং জিসানের মুখ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসায় বেকায়দায় পড়েছেন মুখোশধারী ভদ্রলোকরা।
এদের গতিবিধি নজরদারিতে রেখেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতার আতঙ্কে থাকা কথিত রাতের রাজারা ও ডনরা সম্মান বাঁচাতে এখন তাদের অনেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে তদবির করতে মাঠে নেমেছেন। কেউ কেউ প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করছেন। মোবাইল ফোন বন্ধ করে ও ফেসবুক আইডি নিষ্ক্রিয় করে এদের অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন।
বিমানবন্দরে নিষেধাজ্ঞা ও সীমান্ত এলাকা বন্ধ থাকায় দেশ ত্যাগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। এদের মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুজন শিল্পপতির নামও রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ওইসব প্রভাবশালীর ঘন ঘন বিদেশ যাত্রার তথ্য পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পরীমণি, পিয়াসা, মিশু, জিসান ও দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ব্যক্তিদের পৃথকভাবে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া ভ্রমণের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দেশের বাইরে অবস্থানকালে তাদের অনেকের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ও স্থিরচিত্র এখন গোয়েন্দাদের হাতে।
সূত্র মতে, পরীমণি ও পিয়াসার ঘনিষ্ঠদের ও অপরাধের সহযোগিদের তালিকায় আছে শীর্ষ ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, আমলা, রাজনীতিবিদসহ অনেক প্রভাবশালীর নাম। এদের কেউ কেউ দেশের বাইরেও ‘প্লেজার ট্রিপে’ গেছেন। এ ছাড়াও তাদের সঙ্গে রাতে ঘুরতে বের হওয়া, সিসা বার, পার্টি সেন্টার কিংবা ক্লাবপাড়ায় একান্তে সময় কাটাতেন। ওইসব রাতের রাজার বিষয়ে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই ও আরো বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, চিত্রনায়িকা পরীমণি, কথিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা অনেকের নামের তালিকা মেলার খবর ছড়ালেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে হয়রানি করা হবে না।
মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ দিয়েছেন আসামিরা। বিভিন্ন পেশার অনেকের নাম পেয়েছি। সেসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। সিআইডি এগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে। কোনো নিরীহ মানুষ যেন দোষী না হয় সিআইডি এটা দেখছে।
দুই-তিনজন ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বলেও খবর এসেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে মন্ত্রী বলেন, তারা আমার কাছে আসেননি। তবে আমি শোনার পর আইজিপিকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) মোহা. শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, পরীমণি, পিয়াসা ও মৌর বাসায় যাতায়াত ছিল- এমন ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিদের কোনো তালিকা করা হচ্ছে না।
ডিএমপির কমিশনার বলেন, এসব তরুণীর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে একটি গ্রুপ চাঁদাবাজি করছে। তাদের কবল থেকে রক্ষা পেতে দু-তিনজন ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ভুক্তভোগীরা এসব চাঁদাবাজের বিষয়ে তথ্য দিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, আমদানি নিষিদ্ধ গাড়ি, অস্ত্র, সোনা চোরাচালান ও মুখোশধারী ভিআইপিদের ব্ল্যাকমেইল করে পরীমণি, পিয়াসা ও রাজরা যে অর্থ কামিয়েছেন, তার সন্ধানে নেমেছেন গোয়েন্দারা। তাদের অ্যাকাউন্টের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেবে সিআইডি।
অভিযোগ রয়েছে, পিয়াসার সহযোগী শরিফুল হাসান ওরফে মিশু হাসান এবং তার সহযোগী মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসান এ চক্রের হোতা। তারাই আমদানি নিষিদ্ধ ছয় হাজার সিসির বিভিন্ন মডেলের গাড়ি আনার পর পিয়াসার মাধ্যমে বিক্রি করতেন। এই চক্রের সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি শিল্পগোষ্ঠীর এমডির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নেপথ্যের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আমদানি নিষিদ্ধ বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবসা ছিল পিয়াসা ও মৌয়ের। কয়েক বছরে তারা তথ্য গোপন করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এ ছাড়া সোনা চোরাচালান এবং অস্ত্রের ব্যবসা করেও তারা রাতারাতি ধনী বনে গেছেন। পরীমণি এবং তাদের সহযোগীদেরও একই ব্যবসা আছে বলে তথ্য পেয়েছে র্যাব-পুলিশ। আমদানির পর এসব গাড়ি রাখা হতো মাদানি রোডের মিশুর মালিকানাধীন ইউরো কার সল্যুশনে। পরে ক্রেতা ঠিক করে তা বিক্রি করা হতো।
সূত্র জানায়, গুলশান-বনানী-উত্তরায় বারকেন্দ্রিক অপকর্মে একাধিক গ্রুপ অব কোম্পানির কর্ণধার, অভিজাত এলাকায় ক্লাব পরিচালনায় দায়িত্বরত ব্যক্তি, শীর্ষ পর্যায়ের গাড়ি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী এবং কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে। যারা ওইসব মডেল, নায়িকা বা সুন্দরী তরুণীর সঙ্গ নিতো এবং খুশি হয়ে বিনিময়ে বস্তুগত এবং অবস্তুগত উপহার প্রদান করত।
তবে ওইসব সেনসেশনাল তরুণী তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তাদের সঙ্গ নেয়া ধনীর দুলালদের গোপন ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা দাগের অর্থ হাতিয়ে নিতো। অন্যথায় ওইসব ছবি বা ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে হেনস্তা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হতো।
