প্রেমিকের ছুরিকাঘাতে না ফেরার দেশে কিশোরী ফুলতি

সাইফুল ইসলাম মুকুল, রংপুর ব্যুরো: রংপুরে বিয়ের পিঁড়িতে বসা হলো না তারমিনা আক্তার ওরফে ফুলতির (১৪)। প্রেমিকের ছুরিকাঘাতে গত পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে আজ হেরে গেলেন তিনি।

 

রংপুরের বদরগঞ্জে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ঘুম থেকে ডেকে তুলে ছুরিকাঘাতে আহত করেন মাদরাসা শিক্ষার্থী তারমিনা আক্তার ওরফে ফুলতিকে। ৫ দিন রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন থাকার পর রোববার (১ আগস্ট) সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ফুলতি।

 

এর আগে বুধবার (২৮ জুলাই) উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের সাজানোগ্রাম এলাকায় ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ঘটনাটি ঘটে। তারমিনা লোহানীপাড়া দাখিল মাদরাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তোয়াব আলী ও পারভিন আক্তার দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান ছিল তারমিনা আক্তার ওরফে ফুলতি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওইদিন সকালে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। এদিকে ঘটনার পর গত বৃহস্পতিবার ঘাতক শাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে বদরগঞ্জ থানায় মামলা করা হয়। তার এমন করুণ মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

 

স্বজন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী মিঠাপুকুর উপজেলার বড়বালা এলাকার পশ্চিম বড়বালায় তারমিনা আক্তারের বড় বোন তহমিনার বিয়ে হয়। তহমিনার আত্মীয়তার সম্পর্কে একই এলাকার মোনায়েম হোসেনের বখাটে ছেলে শাখাওয়াতের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তারমিনার ওপর। শাখাওয়াত হোসেন প্রেমের প্রস্তাব দেয় তারমিনাকে।

 

বিয়ের বয়স না হলেও পারিবারিকভাবে তড়িঘড়ি করে গত বুধবার (২৮ জুলাই) তারমিনাকে একই ইউনিয়নের গাছুয়াপাড়া এলাকায় বিয়ের দিন ধার্য করা হয়। এ ঘটনা জানতে পেয়ে শাখাওয়াত হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তারমিনার পরিবারের ওপর। এক পর্যায়ে মোটরসাইকেল যোগে নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে তারমিনার বাড়িতে আসে শাখাওয়াত।

 

এসময় বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে ছিল। এ অবস্থায় ঘুমন্ত তারমিনাকে ভোরে ডেকে দরজার কাছে ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করেন সে। এতে তারমিনার বুক, দুই উরু ও পাজরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তারমিনা। বাড়ির লোকজন ছুটে এসে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে চেতনা হারিয়ে ফেলেন তারমিনা।

 

আশপাশের লোকজন ছুটে এসে শাখাওয়াত হোসেনকে ধাওয়া দিলে সে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে তারমিনাকে গুরুতর আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। গত ৫ দিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন ফুলতি।

 

তারমিনার মামা মানিক মিয়া বলেন, শনিবার রাত ৯টার দিকে শেষবারের মত কথা বলেছিল ফুলতি। আজ সকাল ৬টা ১০মিনিটের দিকে মারা যায়। শত চেষ্টা করেও আমার ভাগনিকে বাঁচানো গেল না। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করেছে তারমিনার বাবা তোয়াব আলী। ধার দেনা করে সে এখন নিঃস্ব। এরপরেও মেয়েকে বাঁচাতে পারলেন তিনি বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি।

 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হামিদুল ইসলাম বলেন, মেয়েটিকে সুস্থ করে তোলার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তার বুক ও পেটের মাঝামাঝি স্থানে রক্তনালী কেটে যাওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে।

 

বদরগঞ্জ থানার ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় ঘাতকের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হয়েছে। এখন সেটি হত্যা মামলা হিসেবে গণ্য হবে। আসামিকে ধরতে আপ্রাণ চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *