ঢাকা    ৭ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



বিভক্ত হেফাজত নানা চাপে কোণঠাসা

প্রকাশিত: ৯:০০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০২১

বিভক্ত হেফাজত নানা চাপে কোণঠাসা

নজর২৪ ডেস্ক- একের পর এক সংকটে পড়ে সময় ভালো যাচ্ছে না হেফাজতে ইসলামের। ২০১৩ সালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে জনস্রোত দেখিয়ে দেশে-বিদেশে আলোড়ন তোলা হেফাজত এমন চাপে পড়েনি আগে।

 

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসহ এত নেতা অতীতে কারাবন্দিও হননি। সংগঠনের ভাবমূর্তি বাঁচিয়ে টিকে থাকার সঙ্গে আইনি মোকাবেলা এখন হেফাজতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা করে সংগঠনটি সাম্প্রতিক সময়ে মাঠে নামে। পরে তাদেরই হরতাল ঘিরে ব্যাপক নাশকতার জেরে নেতাকর্মীর ওপর নেমে আসে শতাধিক মামলার খড়্গ। এর পরই যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড।

 

আরও পড়ুন-

মামুনুলের বিষয়ে হেফাজতের সিদ্ধান্ত জানালেন বাবুনগরী

মামুনুল হক লকডাউনেই গ্রেপ্তার?

‘কতদিন জেলে রাখবে?’, গ্রেপ্তারের আগে হেফাজত নেতা মুফতি সাখাওয়াত

 

সংকটের এখানেই শেষ নয়, প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত হন বাবুনগরীসহ ৪৩ কেন্দ্রীয় নেতা। এ ছাড়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা ও বিতর্কের কারণে বিভক্তি এবং পাঁচ কেন্দ্রীয়সহ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তারের ঘটনায় হেফাজতে বিরাজ করছে এক রকম ‘শীতল’ পরিস্থিতি।

 

এদিকে গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক নেতা লুকিয়ে রেখেছেন নিজেকে। এ রকম প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় এক নায়েবে আমির অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে স্বেচ্ছায় পদ ছেড়েছেন। ভেতরে ভেতরে নেতৃত্বের বিরোধিতা করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে হেফাজতের আরেকটি অংশ।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উগ্রপন্থী কর্মসূচিকে ভুল আখ্যা দিয়ে সংগঠনের একটি পক্ষ বিভিন্ন পর্যায়ে সমঝোতার চেষ্টাও করছে। তবে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ মূল নেতারা মামুনুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং সরকারবিরোধী বেপরোয়া কর্মসূচির নাশকতায় ভুল স্বীকার করার পক্ষে নন। তাঁরা ভাবছেন, এমন পদক্ষেপ নিলে সংগঠনটি জনপ্রিয়তা হারাবে।

 

এমন উভয় সংকটের চাপে হেফাজতের নেতৃত্ব। অন্যদিকে নাশকতা এবং ব্যক্তিগত ঘটনায় নজরদারি করে হেফাজতের কয়েকজন নেতাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক সূত্র। এই প্রক্রিয়ায় আরো কয়েকজন নেতাসহ সংশ্লিষ্টরা হতে পারেন গ্রেপ্তার।

 

কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়েজী বলেন, ‘গত চার-পাঁচ দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আমাদের দেড় শ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সাংগঠনিকভাবে এসব মামলা আমরা মোকাবেলা করব।’

 

তবে সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মো. মীর ইদরিস বলেন, ‘হেফাজত ইমেজ সংকটে পড়েনি। বরং অরাজনৈতিক এই সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা দেখে সরকার মানসিক সংকটে পড়েছে। আমাদের নেতাকর্মীরা কোনো অপরাধ করেননি। সে কারণে চাপে থাকার প্রশ্নই আসে না।’

 

আরও পড়ুন-

এই জুলুমের শেষ একদিন হবে, কোনো জালিম চিরস্থায়ী হয়নিঃ আল্লামা বাবুনগরী

 

নজর২৪, ঢাকা- হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেছেন, সরকার, প্রশাসন, জনগণ সবাইকে নসিহত করছি। আল্লাহকে ভয় করুন। তার আজাবকে ভয় করুন। হাসরের দিনের পাকড়াওকে ভয় করুন। এই জুলুমের শেষ একদিন হবে, পৃথিবীতে কোন জালিম চিরস্থায়ী হয়নি।

 

শুক্রবার (১৬ এপ্রিল) চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার বড় মসজিদ বাইতুল করিমে জুমার আগে বক্তৃতায় আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এসব কথা বলেন।

 

পরে বিকেল ৫টার দিকে হেফাজত আমিরের প্রেস সচিব ও ব্যক্তিগত সহকারী মাওলানা ইন’আমুল হাসান ফারুকী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

 

বাবুনগরী বয়ানে বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা ফেরআউনকেও সুযোগ দিয়েছিলেন কিন্তু ছেড়ে দেননি। মনে রাখবেন আল্লাহ তায়ালা ছাড় দেন ছেড়ে দেন না। এই জুলুমের শেষ একদিন হবে, পৃথিবীতে কোন জালিম চিরস্থায়ী হয়নি, এই রোজা রমজানের দিনে নিরাপরাধ আলেম উলামাদের ওপর অন্যায়ভাবে এই জুলুম আল্লাহ বরদাশত করবেন না। এগুলোর বদলা নেবেন। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আপনারা মরবেন না। আল্লাহর আজাবকে ভয় করুন।’

 

আল্লামা বাবুনগরী পবিত্র কোরআনের সুরা শুরার ৩০ নাম্বার আয়াত পাঠ করে বলেন, আমরা যত বিপদ-আপদে পতিত হই সব আমাদের কর্মের কারণেই। আমরা অন্যায় পথে চলি বলে আল্লাহ তায়ালা বিপদ দেন। আমাদেরকে পাপাচার, অন্যায়, জোর জুলুম পরিহার করতে হবে। না হয় খোদায়ি গজব থেকে কেউ রক্ষা পাবেন না।

 

আল্লামা বাবুনগরী আরো বলেন, এই রোজা রমজানের দিনে নিরাপরাদ আলেম উলামাদের উপর অন্যায়ভাবে জুলুম আল্লাহ বরদাশত করবেন না। সারাদিন রোজা রেখে ইফতার করবে তার সুযোগ দিচ্ছেন না। তারাবীর নামাজ থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, সারারাত বাহিরে বাহিরে লুকিয়ে থেকে সাহরি খেতে আসে, ওখান থেকেও নিয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। রাতে ঘরে ঘরে তল্লাশির নামে মহিলাদের কষ্ট দিচ্ছে নিরাপরাদ সাধারণ জনগণকে ও হয়রানি করা হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, সরকার, প্রশাসন, জনগণ সবাইকে নসিহত করছি। আল্লাহকে ভয় করুন। তার আজাবকে ভয় করুন। হাসরের দিনের পাকড়াওকে ভয় করুন। এই জুলুমের শেষ একদিন হবে, পৃথিবীতে কোন জালিম চিরস্থায়ী হয়নি।

 

ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে আল্লামা বাবুনগরী বলেন, চলমান সংকট নিরসনে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যেখানে যা করা দরকার উলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শক্রমে তা-ই করা হচ্ছে। আপনারা ধৈর্য হারা হবেন না। সবর করুন। দোয়া ও ইসতিগফার পড়ুন। আল্লাহ তায়ালা উত্তম বদলা দিবেন।

 

আরও পড়ুন-

শিগগিরই হেফাজতের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা, চলছে শীর্ষ নেতাদের আলোচনা

 

নজর২৪ ডেস্ক- মামলা, গ্রেপ্তার ও সরকারের চাপ মোকাবিলায় সাংগঠনিক নানা তৎপরতা শুরু করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। তারা দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি গঠন, জেলায় জেলায় আইনি সহায়তা সেল গঠন এবং বিভিন্ন দূতাবাসে স্মারকলিপি দেওয়াসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

 

গত রোববার হাটহাজারী মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। খবর- প্রথম আলোর

 

আগামী ২৯ মে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে সারা দেশের ওলামা-মাশায়েখদের নিয়ে সম্মেলনের আগে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। তবে নেতা–কর্মীদের গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ায় শিগগিরই কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়েও নেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

 

হেফাজত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে হেফাজতের কমিটি রয়েছে। এর বাইরে সারা দেশে ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করাসহ সংগঠনকে এগিয়ে নিতে ‘সাংগঠনিক সেল’ গঠিত হয়। এই সেলের দায়িত্ব দেওয়া হয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব, সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও সহকারী মহাসচিব মুফতি শাখাওয়াত হোসেনকে।

 

জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, সাংগঠনিক সেলের মাধ্যমে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সারা দেশের কমিটিগুলোর কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা হবে। এ জন্য রোববারের সভায় তিনজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

গ্রেপ্তার নেতা–কর্মীদের মুক্তি ও মামলা পরিচালনার জন্য আইনি সহায়তা সেল গঠনের সিদ্ধান্ত হয় ওই সভায়। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় দুই থেকে তিন সদস্যের আইনি সহায়তা সেল গঠন করা হবে আইনজীবীদের নিয়ে। হেফাজতের কার্যক্রম, মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।

 

হেফাজত নেতারা জানান, আগামী ২৯ মে যে ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাতে হেফাজতে ইসলামের বাইরে চরমোনাই পীর, ছারছিনার পীর, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতসহ সমমনা ইসলামি দলগুলোর নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।

 

হেফাজতে ইসলামের সহকারী অর্থ সম্পাদক আহসান উল্লাহ বলেন, ‘সম্মেলনে আমরা সবাইকে আমন্ত্রণ জানাব। হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন। আকিদাগতভাবে কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকলেও সবার উদ্দেশ্য ইসলামের জন্য কাজ করা। আশা করি সবাই আসবে।’

 

এদিকে হাটহাজারী মাদ্রাসায় রোববার বৈঠক শেষে ফেরার পথে ওই রাতেই আটক হন হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি এখন ২০১৩ সালে ঢাকায় সহিংসতার মামলায় রিমান্ডে আছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় করা মামলায় প্রায় প্রতিদিন হেফাজত নেতা–কর্মীরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। প্রয়াত আমির আহমদ শফীকে ‘পরিকল্পিত হত্যার’ অভিযোগে করা মামলায় বর্তমান আমির জুনায়েদ বাবুনগরীসহ ৪৩ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই।

 

এই অবস্থায় সারা দেশের হেফাজত নেতা–কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। কর্মসূচি দেওয়ার কথাও ভাবছেন সংগঠনটির নেতারা।

 

এটা সরকারকে চাপে ফেলতে হেফাজত নতুন করে সংগঠনিক কার্যক্রমের উদ্যোগ নিয়েছে কি না, এই প্রশ্ন করা হলে হেফাজতের সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস বলেন, ‘সরকারকে চাপে ফেলতে কিংবা সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য নয়। যে লক্ষ্যে হেফাজত গঠিত হয়েছে, তার জন্য কাজ করা হচ্ছে। বরং সরকার হেফাজতকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলার জন্য পুরোনো মামলাগুলো সচল করছে। আট বছর আগের মামলায় নেতা–কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে।’

 

নতুন কর্মসূচির পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন,‘আমরা সারা দেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করছি। সভা করতে না পারলে শিগগিরই ভার্চ্যুয়াল সভায় পরামর্শ করে কর্মসূচি দেওয়া হবে। সেটা রমজানের মধ্যেও হতে পারে।’

 

এর আগে সারাদেশে গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমির ও হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষা পরিচালক আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।

 

সোমবার (১২ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে আমীরে হেফাজত বলেন, হেফাজতে ইসলাম দেশে শান্তি শৃঙ্খলা চায়। তবে জুলুমবাজদের জুলুমে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে দেশবাসীকে সাথে নিয়ে সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।

 

হুশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, আমাদের নিকট খবর এসেছে গভীর রাতে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হেফাজত নেতাকর্মীদেরকে হয়রানি করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে। হেফাজতে ইসলাম দেশে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস চায় না। হেফাজত ইসলাম শান্তি চায়। হেফাজতে ইসলাম একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপ্রিয় সংগঠন।

 

তবে নেতাকর্মীদের উপর এভাবে জুলুম চলতে থাকলে আমরা নিশ্চুপ ঘরে বসে থাকবো না। দেশবাসীকে সাথে নিয়ে শান্তিপূর্ণ দূর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবো।