জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম- চট্রগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার দাতঁমারা ইউনিয়নের হেয়াকো বাজারে অবস্থিত ‘ঈশা গেস্ট হাউজ’। অসামাজিক কার্যকলাপের দায়ে একাধিকবার সিলগালা করা হলেও এখনো বন্ধ হয়নি আবাসিক এ হোটেলটি। দাতঁমারা ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ জানে আলমের যোগসাজশে অনেকটাই প্রকাশ্যে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোঃ আলী আক্কাছ মজুমদার (ভুট্টো)।
এদিকে নিজের প্রতিষ্ঠান সিলগালা হলেও ক্ষমতার খায়েশ মেটাতে ফটিকছড়ির প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হেয়াকো বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃত্ব দিতে চান ভুট্টো। ইতিমধ্যে সভাপতি পদে একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র কিনেছেন তিনি।
জানা যায়, আলী আক্কাছ মজুমদার (ভুট্টো) এশিয়ার বৃহত্তম দাঁতমারা রাবার বাগানের টিএস (ট্রেফিং সুপার ভাইজার)। সরকারি কর্মকর্তা হলেও এলাকায় তিনি প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। সেইসাথে দাতঁমারা ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ জানে আলমের সমর্থনপুষ্ট থাকায় ইচ্ছে থাকলেও ভুট্টোর বিপক্ষে নির্বাচন করতে পারছেন না কেউ।
ব্যবসায়ীরা জানায়, আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি উত্তর ফটিকছড়ির বৃহৎ এ বাণিজ্যিক কেন্দ্রটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গত রোববার (০৭ ফেব্রুয়ারি) মনোনয়ন বিক্রির শেষ দিনে ১৩টি পদের বিপরীতে অনেকে মনোনয়ন সংগ্রহ করলেও ভূট্টোর সঙ্গে লড়ার করার সাহস দেখাননি কেউ। ফলে সভাপতি পদে একক প্রার্থী হয়েছেন তিনি।
এদিকে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে হেয়াকো বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না কেউ।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে হেয়াকো বাজার ব্যবসায়ী সমিতির কোনো নির্বাচন হয়না। সম্প্রতি দাতঁমারা ইউপি চেয়ারম্যান ও হেয়াকো বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জানে আলমের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে গত ১ জানুয়ারি তারা একটি ভোটার তালিকাও প্রকাশ করেন।
যেখানে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অনেক অযোগ্য ভোটার অন্তর্ভূ্ক্ত করেন ইউপি চেয়ারম্যান জানে আলম। এরমধ্যে রয়েছেন আলী আক্কাছ মজুমদার (ভুট্টো)ও। অন্যদিকে প্রায় শতাধিক স্থায়ী ব্যবসায়ীর নাম নেই তালিকায়।
সূত্র জানায়, হেয়াকো বাজারে অবস্থিত আক্কাছ মজুমদার (ভুট্টো)র মালিকানাধীন ‘ঈসা গেস্ট হাউজ’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানটিতে ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। এসময় ওই প্রতিষ্ঠানে এক নারী ও দুই পুরুষকে অসামাজিককাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় ওই গেস্ট হাউজ সিলগালা ও ওই তিনজনকে ৩ মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এদিকে সিলগালা করে দেওয়ার পর কয়েকদিন বন্ধ থাকলেও ইউপি চেয়ারম্যানের দাপটে গেস্ট হাউজটি ফের পূর্বের রুপে ফিরিয়ে নিয়ে যান প্রতিষ্ঠানটির মালিক ভুট্টো। প্রতিদিন অসামাজিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি রাতভর চলতে থাকে মদ ও জুয়ার আসর।
পরবর্তীতে একই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ৩০ জুন সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সায়েদুল আরেফিনের নেতৃত্বে গেস্ট হাউজটিতে আবারও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এসময় প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই হোটেলে থাকা ১০-১২ জন নারী পুরুষ পালিয়ে গেলেও অসামাজিক কর্মকান্ডে লিপ্ত এক নারীকে আটক করে উপজেলা প্রশাসন। একইসাথে ওই গেস্ট হাউজকে দ্বিতীয়বারের মতো সিলগালা করে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, দুইবার সিলগালা করে দেওয়ার পরও এখনো পেছনের দরজা দিয়ে দিব্যি অসামাজিক কর্মকান্ডের ব্যবসা পরিচালনা করছেন ভুট্টো। বর্তমানে সরকারিভাবে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি অবৈধ থাকলেও বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সদ্য প্রকাশিত ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে তার নাম। সেখানে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ঈশা গেস্ট হাউজ’। এছাড়া একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি কিভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং বাজার ব্যবসায়ী সমিতিতে নেতৃত্ব দিতে চান তা বোধগম্য নয়।
তাদের অভিযোগ, শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সবকিছু জেনেও ইউপি চেয়ারম্যান জানে আলম ভুট্টোকে ব্যবসায়ী নেতা বানাতে সহায়তা করছেন। এ নিয়ে ভোটারদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কানাঘুষা চলছে মূলত গেস্ট হাউসকে নিরাপদ ব্যবসায় পরিণত করতে সভাপতির পদ দখল করতে মরিয়া তিনি।
এ বিষয়ে ‘ঈশা গেস্ট হাউজ’র সত্ত্বাধিকারী মোঃ আলী আক্কাছ মজুমদার (ভুট্টো) বলেন, কেউ একজন মদ খেলে তাকে মদ খাওয়ার অপরাধে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায় না, বরং আমি সভাপতি প্রার্থী দাঁড়ালাম। এখন আমার বিপক্ষ লোকজন জয়ী হতে পারবে না বিধায় নানা অপ্রচার ছড়াচ্ছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গেস্ট হাউসটি আমি যখন ভাড়া দিয়েছিলাম তখন একটা ঘটনা ঘটেছিল, পরে টিএনও সাহেব বললেন এটা ভাড়া দেওয়া যাবে না। তাই আমি নিজেই ট্রেড লাইসেন্স করে ব্যবসা করতেছি। বাজারে আমার আরও ২/৩টি দোকান রয়েছে। আপনারা এসে দেখতে পারেন। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে সব উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে মনে করি।’
‘প্রশাসন মুচলেকা নিয়ে গেস্ট হাউজটি পুনরায় চালুর অনুমতি দিয়েছেন বলেও এসময় দাবি করেন ভুট্টো।’ যদিও ইউএনও বলেছেন, এটি খোলার অনুমতি দেননি তিনি।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দাতঁমারা ইউপি চেয়ারম্যান ও হেয়াকো বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোঃ জানে আলম বলেন, বাজার কমিটির সদস্যদের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার পরও ভূট্টোর বিষয়ে কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেনি। এমনকি ইউএনও সাহেব পরপর দুবার ঈষা গেস্ট হাউসে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করলেও বাজার কমিটির সদস্য পদ থেকে বাতিল করার কোন নির্দেশনা দেয়নি। যার ফলে কমিটির নীতি নির্ধারকেরাও কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
হয়ত তিনি এলাকার প্রভাবশালী বিধায় কেউ অভিযোগ করেননি, কিন্তু উনার গেস্ট হাউসের অনৈতিক কার্যকলাপ তো আপনারা দেখেছেন, যা এখনো চলছে! আপনারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? জানতে চাইলে জানে আলম জানান, এটা একক একক সিদ্ধান্ত নয়, পুরো দেশটাই চলতেছে প্রভাবশালীদের দখলে। আমার বিরুদ্ধেও দুদকে অভিযোগ দিয়েছে।
এসময় সিলগালা অবস্থায় গেস্ট হাউজ চালু ও নির্বাচনে অংশগ্রহণে ভুট্রোর সঙ্গে নিজের কোনো যোগসাজশ নেই বলে দাবি করেন প্রভাবশালী এই ইউপি চেয়ারম্যান।
এ বিষয়ে হেয়াকো বাজার ব্যবসায়ী কমিটির কল্যাণ সমিতির নির্বাচন পরিচালনা পরিষদের প্রিজাইডিং অফিসার ও উপজেলা সমাজসেবা অফিসার রাজিব আশ্চায্য বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। সম্প্রতি নির্বাচনের তালিকা করতে আমরা ৫-৬ দিন সময় নিয়েছি। এই সময়ে কেউ লিখিত বা মৌখিকভাবে অভিযোগ দেয়নি, অভিযোগ দিলে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নিতাম।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সায়েদুল আরেফিন বলেন, কোনো বে-আইনি কিছু হলে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গেস্ট হাউজ মুচলেকায় খুলে দেওয়া হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ওসি ভুজপুর দেখবে সেটি। আমি খোলার অনুমতি দেইনি। ওসির সাথে কথা বলুন।
ভুজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ. আব্দুল্লাহ বলেন, হেয়াকো বাজারের ঈশা গেস্ট হাউসটি পুনরায় চালু করেছে বলে শুনেছি। অনেক কথাও শোনা যায় সেটা সত্য। তবে যদি কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারে ওখানে অনৈতিক কাজকর্ম চলে তাঁকে পুরস্কৃত করা হবে।
সিলগালাকৃত গেস্ট হাউস কি করে খুলে ব্যবসা করে, এই বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি জানেনা বলে ফোন কেটে দেন।
