রংপুরে ৪৯ বছর পর দৃশ্যমান সেই ভয়াল কুয়া

সাইফুল ইসলাম মুকুল, রংপুর ব্যুরো: রংপুর নগরীতে টাউন হল বধ্যভূমিতে দীর্ঘ ৪৯ বছর পর দৃশ্যমান হয়েছে সেই ভয়াল কুয়া, যেখানে শত শত নারী-পুরুষকে নির্যাতন করে হত্যা করে লাশ ফেলে দিতো হানাদার বাহিনী। মিলেছে মানুষের হাড়, দাঁতের অংশবিশেষ। কুয়াটির সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রংপুর টাউন হলে পাক হানাদার বাহিনী একটি ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। সেখানে তারা একটি র্টর্চার সেলও স্থাপন করে। দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধকালে পাক হানাদার বাহিনী রংপুরসহ আশপাশের জেলা থেকে নিরীহ মানুষ ও মেয়েদের ধরে নিয়ে আসত।

 

তাদের ওপর চালাতো অবর্ণনীয় নির্যাতন আর পাশবিকতা। টাউন হলের পেছনে খালি জায়গায় ছিল একটি বিরাট কুয়া। বাঙালিদের নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ ওই কুয়ায় ফেলে দেয়া হতো। একইভাবে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করে তাদের সেই কুয়ায় ফেলে দেয়া হতো। এভাবে শত শত নারী-পুরুষকে হত্যা করে সেখানে ফেলে দেয়া হয়েছে।

 

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল টাউন হলে এসে ওই কুয়ার কাছে অসংখ্য নারীদের পরিধেয় বস্ত্র হাড়-গোড় দেখতে পায়। এরপর ওই জায়গাটি বেদখল হয়ে যায়, গড়ে ওঠে স্থাপনা। সরকার ওই বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিলে কাজ শুরু করতে গিয়ে মাটি খননে সেই কুয়াটি দৃশ্যমান হয়।

 

সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় হাড়-গোড়সহ বিভিন্ন জিনিষপত্র। প্রত্যক্ষদর্শী রংপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মোছাদ্দেক হোসেন বাবলু বলেন, ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে তারাই প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রংপুর শহরে প্রবেশ করে। তারা রংপুর টাউন হলে গিয়ে দেখতে পান, সেখানে বেশ কয়েকজন নারী বস্ত্রহীন অবস্থায় আধামরা অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি জানান, আমরা আমাদের পরনের চাদর ও কাপড় সংগ্রহ করে তাদের দেই। এরপর তাদের টাউন হল থেকে বাইরে এনে তাদের বাড়িতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করি।

 

তিনি আরও জানান, টাউন হলের পেছনে একটি বিশাল কুয়া ছিল সেখানে মাথার খুলি, হাড়-গোড়, পরনের কাপড়, শাড়িসহ বিভিন্ন সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখি। কুয়ার ভেতরে বেশ কয়েকটি লাশও আমরা দেখতে পাই। তিনি জানান, টাউন হলের কুয়াটি পাক বাহিনী তাদের অন্যতম টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে অনেক লাশ ফেলে দিয়েছে।

 

এদিকে সেক্টরস কমান্ডারস ফোরাম-এর রংপুরের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত হোসেন জানান, আমরাই প্রথম টাউন হলের পেছনে ইটের গাথুনি দিয়ে একটি প্রতিকী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করি সেখানে প্রতিবছর বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করত। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এই বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হোক। দেরিতে হলেও সরকার এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যেগ গ্রহণ করেছে। সেই ভয়াল কুয়াটি এতদিন ভরাট হয়ে গিয়েছিল অবৈধভাবে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল।

 

প্রশাসন দখলমুক্ত করে স্মৃতিসৌধের কাজ শুরু করতে গিয়ে কুয়াটি দৃশ্যমান হয়। সেখান থেকে মানুষের হাড়-গোড়, দাঁত উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা ওই কয়াটি সংরক্ষণ করার দাবি জানিয়েছি যাতে পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে পাক হানাদারের বর্বরতা।

 

ঘাতক দালাল নিমূল কমিটির সভাপতি ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু জানান, আমরা টাউন হল বধ্যভূমিতে কুয়াটি দৃশ্যমান হওয়ার পর সেটাকে সংরক্ষণ করার দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। আমরা বলেছি স্মৃতিসৌধের পাশেই যেন কুয়াটি সংরক্ষণ করা থাকে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর নৃশসংতার কথা।

 

এ ব্যাপারে রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান জানান, আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি কুয়াটি সংরক্ষণ করার সেই সঙ্গে কুয়াটির পুরোটাই খনন করতে। স্মৃতিসৌধের পাশাপাশি কুয়াটিও দৃশ্যমান রাখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *