বোরকা পরে দিনে ভিক্ষা, রাতে পথে পথে খদ্দেরের অপেক্ষা…

নজর২৪ ডেস্ক- ‘ভাই, পেটের দায়ে এখন দিনের বেলায় বোরকা পরে ভিক্ষা করি। আর রাতের বেলায় খদ্দেরের আশায় ফুটপাতে বসে থাকি। কিন্তু কোনো খদ্দের পাই না। কীভাবে বেঁচে আছি তা বলে বোঝাতে পারব না।’

 

মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) রাতে আক্ষেপ করে এসব কথা বলছিলেন ৩৫ পেরোনো নারী রেশমা (ছদ্মনাম)। খবর- নিউজবাংলার

 

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার ভাসমান এই যৌনকর্মী জানান, শুধু তিনি না, তার মতো শত শত নারী খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। লকডাউন তাদের জীবন তছনছ করে দিচ্ছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

 

রেশমা বলেন, ‘এখন তিন বেলা খাবারই তো জুটছে না। এই যে কোরবানির ঈদ চলে গেল, পেয়েছি শুধু কয়েক টুকরা মাংস। ঈদের শখ মেটানো তো অনেক দূরের কথা।’

 

মঙ্গলবার রাতেই রমনা পার্ক এলাকায় কথা হয় নানা বয়সী কয়েকজন ভাসমান যৌনকর্মীর সঙ্গে। তাদের একজন ২৫ বছর বয়সী সাজেদা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ভাই, আমরা দিন এনে দিন খাই। বিপদের জন্য কোনো সঞ্চয় আমরা রাখতে পারি না। পরিবারের সঙ্গে পাঁচ বছর কোনো সম্পর্ক নাই।

 

‘এখন যে তাদের কাছে যাব, সেই মুখও নাই। তারপরও তো বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু এই লকডাউনে খদ্দের পাব কোথায়, কেউ তো বাসা থেকেই বের হয় না। তা ছাড়া করোনার কারণে কেউ কাছে আসতে চায় না। এমনকি রিকশাচালকরাও আসে না এখন।’

 

খদ্দের না থাকলে ভিক্ষা ছাড়া আর কী করব- এ প্রশ্ন রেখে সাজেদা বলেন, ‘খদ্দের পাব না জেনেও আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি। করোনার শুরু থেকেই এ রকম যাচ্ছে দিনকাল। তারপরও আশায় আশায় রাত জেগে অপেক্ষায় থাকি, যদি কেউ আসে।’

 

রমনা পার্ক এলাকার আরেক ভাসমান যৌনকর্মী ২৫ বছর বয়সী ছন্দা (ছদ্মনাম) জানান, দিনের পর দিন কাজ না পেয়ে বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না। অনেকেই রাস্তার পাশে যাত্রীছাউনি, ফুটওভার ব্রিজ ও স্টেশনে স্টেশনে থাকছেন।

 

ছন্দা বলেন, ‘এখন রাতে খদ্দের তো পাই-ই না, দিনের বেলায় ভিক্ষা করে যা কামাই তা দিয়ে কোনো রকমে পেট চালাচ্ছি। বাসা ভাড়া পাব কোথায়?’

 

তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরেই এই অবস্থা আমাদের। এর মাঝে গার্মেন্টসে চাকরির জন্য গেছি। কিন্তু করোনার কারণে নতুন কোনো লোক নিচ্ছে না কোনো কারখানা। তাই বাধ্য হয়ে দিনের বেলায় বোরকা পরে পথে পথে ভিক্ষা করি, যাতে পুরাতন কোনো কাস্টমার চিনতে না পারে।’

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর এসব ভাসমান যৌনকর্মীর মতো দশা দেশের বিভিন্ন শহরের ভাসমান যৌনকর্মীদেরও।

 

ক্ষুধার জালায় নারায়ণগঞ্জের অনেক ভাসমান যৌনকর্মীও বোরকা পরে দিনের বেলায় ভিক্ষা করছেন বলে জানান সেখানকার যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘অক্ষয় নারী সংঘ’-এর সভাপতি কাজল আখতার।

 

তিনি বলেন, ‘ভিক্ষাও যে ভালো হচ্ছে, তাও না। কারণ দোকানপাট খোলা নাই, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। তাই অনেক ভাসমান মেয়ে পথে পথে ভিক্ষা করছে, যা পাচ্ছে তাই দিয়ে কোনো রকম চাল-পানি খেয়ে দিন পার করছে।’

 

কাজল জানান, কিছু মেয়ে আছে যারা যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করলেও সমাজ জানে না। অনেক মেয়ে আছে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে।

 

‘কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে তাদের অনেকে বাসা ছেড়ে দিয়ে এদিক-সেদিক দিন কাটাচ্ছে। কারণ বাড়িওয়ালারা চাপ দিচ্ছে ভাড়ার জন্য। কিন্তু মেয়েগুলো ভাড়া দিবে কোথা থেকে? ওদের তো জমানো টাকাও নেই যে সেখান থেকে ভেঙে টাকা-পয়সা খরচ করে চলবে’, বলেন তিনি।

 

এরা আসে কোথা থেকে?

 

এসব নারী কীভাবে এই জীবনে আসছেন- জানতে কথা হয় রাজধানী ঢাকার একটি যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘দুর্জয় নারী সংঘের’ সদস্য রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে।

 

তিনি বলেন, ‘একটা সময় ছিল দালালের মাধ্যমে মেয়েগুলো বিক্রি হতো। আবার অনেক মেয়ে প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে রাগেরবশত ব্রোথেলে আসত। কোনো কোনো মেয়ের প্রেমিক প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের পতিতালয়ে বিক্রি করে যেত জোর করে সর্দারনির কাছে।

 

‘তবে বেশ কয়েক বছর যৌনকর্মীদের সংগঠন হওয়ার কারণে ওগুলো আর করতে পারে না পতিতালয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে। এখন স্বেচ্ছায় আসলে আসতে পারে। দালাল বা সর্দারনির মাধ্যমে আসতে পারে না।’

 

রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘এখন যারা আসে তাদের মধ্যে অনেকে আছে ধর্ষণের শিকার মেয়ে। আবার দেখা যায়, কোনো মেয়ে ছোট চাকরি করে, কিন্তু বেতন-ভাতা ঠিকমতো পায় না, তখন সংসার চালাতে কাছের বান্ধবীর মাধ্যমে এ পথে আসছে। সারা দিন অন্য কাজ করছে, আর রাতের বেলা ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করছে।’

 

একটা পর্যায়ে এসব ভাসমান যৌনকর্মীই পতিতালয়ে চলে যান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন পতিতালয়ে যে সর্দারনি থাকে, তার মাধ্যমে লাইসেন্স নিয়ে নেয়। তখন তারা ফুলটাইম যৌনকর্মী হয়ে যায়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *