কক্সবাজারে সক্রিয় অপহরণকারী চক্র, ১৬ ঘন্টা পর মুক্তিপণে কলেজছাত্র মুক্ত

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি অপহরণকারী চক্র। গত কয়েক মাসে পরপর পাঁচটি অপহরণের ঘটনায় এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়েছে।

 

এদিকে একের পর অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় করার মাধ্যমে অপহরণকারীরা তাদের অবস্থান জানান দিলেও ওই চক্রের কোন সদস্যকে এখনো পর্যন্ত ধরতে পারেনি পুলিশ।

 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব অপহরণের ঘটনার পেছনে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী জড়িত থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে না।

 

এসব চক্র বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে অস্ত্র ঠেকিয়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। চোখ-মুখ হাত-পা বেঁধে আটকে রাখা হয় গোপন আস্তানায়। তাদের মূল উদ্দেশ্য টাকা আদায়। কিন্তু টাকা আদায় করতে গিয়ে তাদের অমানবিক নির্যাতনে শারীরিক, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা।

 

বাঁশের লাঠি থেকে শুরু করে লোহার রড দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। ইলেকট্রিক শক থেরাপি ওদের মূল অস্ত্র। পুরুষের লজ্জাস্থানে ইট বেঁধে নির্যাতনের ঘটনাও শুনা যায়। কখনো প্লাস দিয়ে নখ তুলে নেয়া হয়। রক্তাক্ত ভুক্তভোগীর কান্নার শব্দ শোনানো হয় স্বজনদের। দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে চাইলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। আর টাকা দিতে অপারগতা জানালে শুরু হয় আরো ভয়াবহ নির্যাতন। সময় যত বাড়ে নির্যাতনের মাত্রাও তত বাড়ে। এভাবেই অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা মানুষকে নির্যাতন করে টাকা আদায় করে। সম্প্রতি অপহরণের শিকার এক কলেজ ছাত্র ও কয়েকজন ভুক্তভোগীরা নির্যাতনের এমন বর্ণনা দিয়েছেন।

 

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, অপহরণকারীদের চাহিদা মতো টাকা না দিলে গোপন অঙ্গে ইট বেঁধে রাখা হয়। তাদের কথা না শুনলে ইলেকট্রিক শক দিয়ে চলে লোমহর্ষক নির্যাতন। আর এমন নির্যাতন চলে চাহিদা মতো টাকা আদায়ের আগ পর্যন্ত। শুধু চাহিদামতো টাকা দিলেই মুক্তি মেলে না। ছেড়ে দেয়ার আগে বস্ত্রহীন করে যুবতীদের সঙ্গে অশালীন ছবি ও ভিডিও করে রাখা হয়। সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করা হবে বলে জানানো হয়।

 

এছাড়া চক্রের দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয় ভুক্তভোগীর স্বজনরাও আছেন নানা আতঙ্কে। প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি ও অশালীন ভিডিও করে রাখায় ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খুলছেন না।

 

সর্বশেষ মোঃ আব্দুল্লাহ নামের এক কলেজ ছাত্র ১৬ ঘন্টা পর মুক্তিপণে মুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবার। মঙ্গলবার (৯ মার্চ) রাত ১১ টায় ঈদগাঁও মেহেরঘোনা এলাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

তার চাচা মৌলনা নুর মোহাম্মদ জানান, ঈদগাঁও মেহেরঘোনা গ্রামের পুর্ব পাশ্বে জঙ্গলের ভিতর অপহরণকারীদের কথামত এক জায়গায় নগদ ৩০ হাজার টাকা রেখে দেওয়ার ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট পর অপহৃত মোঃ আব্দুল্লাহ কে ছেড়ে দেওয়া হয়। অপহৃত মোঃ আব্দুল্লাহ কে শারীরিক নির্যাতনের কারনে সে খুবই অসুস্থ। বর্তমানে ঈদগাঁও জমজম হাসপাতালে মোঃআব্দুল্লাহ কে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার ছোট ভাই মোঃ ওমর ফারুখ জানান, অপহরনকারীরা প্রথমে ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবী করলেও পরে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণে ছেড়ে দিয়েছে আমার ভাইকে।

 

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৭ টায় অটো-রিক্সা যোগে কলেজ পড়ুয়া ছাত্র মোঃআব্দুল্লাহ ও তার ছোট ভাই মোঃ ওমর ফারুখ একই গ্রামের অটোরিক্সা চালক নজরুল ইসলামের গাড়ীতে করে বড় বোন ছাদিকা আকতারের এনগেজমেন্ট অনুষ্টানের বাজার করতে ঈদগাঁও যাচ্ছিল। প্রতি মধ্যে গজালিয়ার পানের ছড়া ঢালা এলাকায় গেলে উৎপেতে থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা গাড়ীটি থামিয়ে কলেজ ছাত্র মোঃ আব্দুল্লাহকে অপহরণ করে গহীণ বনে নিয়ে গিয়েছিল। প্রায় ১৬ ঘন্টা অপহরণকারীদের কবল থেকে অবশেষে মুক্তিপণে মুক্ত হল কলেজ ছাত্র মোঃ আব্দুল্লাহ।

 

তিনি জানান, আমাকে চোখ বেঁধে গহীন বনের প্রায় ৩ কিঃমিঃ দুরে নিয়ে অমানবিক ভাবে শারীরিক নির্যাতন করেছে অপহরণকারীরা অপহ্নত মোঃ আব্দুল্লাহ কে ফিরে পেয়ে এলাকাবাসী মহান সৃষ্টি কর্তার দরবারে শোকরিয়া জ্ঞাপন করে চিহ্নিত ডাকাত অপহরণ কারীদের গ্রেপ্তার করার জোর দাবী জানিয়েছেন।

 

এদিকে ঈদগড়ের জনপ্রিয় সংগিত শিল্পী জনি ও দিনমজুর মোঃ কালু ঈদগড়-ঈদগাঁও সড়কে ডাকাতের গুলিতে নিহত হওয়ার ৭ মাস পর সন্ত্রাসীরা আবারো সুসংগঠিত হয়ে সড়কে ডাকাতি অপহরণ শুরু করাই সড়কে যাতায়াতকারি যাত্রী ও ঈদগড় বাইশারীর প্রায় ৭০ হাজার অসহায় মানুষ শংকিত। এলাকাবাসী দ্রুত চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে চিহ্নিত ডাকাত অপহরণকারীদের গ্রেপ্তারের দাবী জানিয়েছেন।

 

এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এগুলো নিয়ে আতংকিত হবার কিছু নেই। আমরা সব অপরাধীদের ট্রেস করতে পেরেছি। পুলিশ কাজ করছে। খুব শিঘ্রই অপহরণের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। আর ঘটনার তদন্তকালে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে যত প্রভাবশালীই হোক তাকে ছাড় দেয়া হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *