রংপুরে এখনো অরক্ষিত অনেক বধ্যভূমি

সাইফুল ইসলাম মুকুল, রংপুর ব্যুরো: মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জাফরগঞ্জ ব্রিজের পাশে রংপুর শহরের ব্যবসায়ী অশ্বিনী ঘোষসহ ১৯ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ব্রিজের ওপর দুই দিনে ১০ জনকে হত্যা করা হয়। সেখানে আজও কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না জাফরগঞ্জ ব্রিজ বধ্যভূমির কথা। স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হতে চলছে। জাফরগঞ্জ ব্রিজ সংলগ্ন বধ্যভূমির মতো এখনও রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো পুরোপুরি সংরক্ষণের আওতায় আসেনি। নির্মিত হয়নি স্মৃতিস্তম্ভ বা শহিদদের নামফলক।

 

সম্প্রতি রংপুরে একাত্তরের শহিদদের স্মৃতিবিজড়িত কয়েকটি বধ্যভূমি সংস্কার করা হয়েছে। তবে সেগুলোর নেই যথাযথ সংরক্ষণ। আবার অনেক জায়গায় বছরের পর বছর অযত্ন আর অবহেলায় অরক্ষিতভাবে পড়ে থাকা বধ্যভূমিগুলো নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। তবে প্রশাসন বলছে, অনেক বধ্যভূমি ও গণকবর নতুন করে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে বাকি বধ্যভূমিরগুলোর কাজও করা হবে।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুরের অধিকাংশ বধ্যভূমি ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ঢাকা। নেই যাতায়াতের রাস্তা। নির্দিষ্ট দুই একটি দিন ছাড়া সারা বছরই বধ্যভূমিগুলো থাকে অরক্ষিত। চারপাশে খোলা আবার কোনোটা গরু-ছাগলের চারণভূমি। দিনের আলো শেষে সন্ধ্যায় অন্ধকারে থাকে জাতির শ্রেষ্ঠ সূর্য সন্তানদের স্মৃতিচিহ্ন। দেখাশুনার লোক না থাকায় কোথাও কোথাও ব্যক্তি দখলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আবার হঠাৎ দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা বধ্যভূমি আর কোন জায়গায় রয়েছে গণকবর। কোথাও চলেছে চাষাবাদ।

 

রংপুরে ছোট-বড় অনেক বধ্যভূমি থাকলেও জেলা প্রশাসন থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩টি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো- রংপুর টাউন হল, দখিগঞ্জ শ্মশান, সাহেবগঞ্জ, দমদমা, বালার খাইল, নব্দীগঞ্জ, লাহিড়ীরহাট, ঘাঘট নদী, নিসবেতগঞ্জ, জাফরগঞ্জ ব্রিজ, বদরগঞ্জের ঝাড়ুয়ার বিল ও পদ্মপুকুর এবং মিঠাপুকুর উপজেলার জয়রাম আনোয়ারা বধ্যভূমি। এছাড়া জানা-অজানার মধ্যে রয়েছে মডার্ন সিনেমা হল, নারিরহাট, শংকরদহ, বৈরাগীগঞ্জ, বলদিপুকুর, দেবীপুর, শিবগঞ্জ এলাকা বধ্যভূমি এবং রংপুর সেনানিবাস গণকবর।

 

রংপুরের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের ঝাড়ুয়ার বিল ও পদ্মপুকুর। ১৯৭১ সালে ঝাড়ুয়ার বিলে একসঙ্গে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে পাকিস্তানি হানাদাররা গুলি করে হত্যা করে। ২০১৬ সালে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। হারাগাছ রোডের পাশে রংপুর জেলখানা থেকে ১৯ জন বন্দী ইপিআর সদস্যকে ধরে এনে হত্যা করা হয়। সাহেবগঞ্জের মাঝামাঝি একটি স্থানে থাকা বধ্যভূমিতে শহিদদের গণকবর ছিল। গত বছর সংরক্ষণ কাজের সময়ে সেখান থেকে রক্তমাখা কাপড়সহ হাড়গোড় উদ্ধার হয়। বর্তমানে গণকবর না থাকলেও সেখানে নামফলকসহ একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

 

রংপুর টাউন হল ছিল পাকিস্তানি হায়েনাদের আমোদ ফূর্তির জায়গা। এটাকে টর্চারসেল বানানো হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাদের নারী নির্যাতনের একটি প্রধান কেন্দ্র এই টাউন হলে মেয়েদেরসহ মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিকামী মানুষদের আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন শেষে মেরে ফেলা হতো। এর পেছনের একটি কূপে ওই সব লাশ ফেলে দেওয়া হতো। গত বছর টাউন হল চত্বর বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজের জন্য মাটি খুঁড়তে গিয়ে কূপ থেকে মানুষের বেশ কিছু হাড়গোড় পাওয়া গেছে। বর্তমানে সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

 

জাফরগঞ্জ এলাকার জয়নাল মিয়া বলেন, আপনারা সবাই শুধু ছবি নিয়ে যান। কিন্তু এখানে আজ পর্যন্ত কোনো সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখলাম না। মানুষ কীভাবে বুঝবে এটা বধ্যভূমি? ৫০ বছর পার হচ্ছে কেউ এটা সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়নি। আমরা চাই এখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও ইতিহাসসহ নামফলকের ব্যবস্থা করা হোক।

 

রংপুর শহরের নিসবেগঞ্জ এলাকায় ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ২৩তম বিগ্রেড হেডকোয়ার্টার। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ হাজার হাজার মানুষ তীর-ধনুক-বল্লম-লাঠি-দা-কুড়াল এবং বাঁশের লাঠি হাতে রংপুর সেনানিবাস আক্রমণে বাঙালিদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অসংখ্য মানুষ। ঘাঘট নদের পানি সেই দিন হাজারো শহিদের রক্তে লাল হয়ে যায়। এতে এই ঘাঘট নদের তীর একটি বৃহৎ বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। সেখানে শহিদদের স্মরণে রক্তগৌরব নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

 

কারমাইকেল কলেজ থেকে দুই মাইল দক্ষিণ-পূর্বে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে ব্রিজের পাশে দমদমা বধ্যভূমি। এখানে ৩০ এপ্রিল কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক রামকৃষ্ণ অধিকারী, কালাচাঁদ রায়, সুনীলবরণ চক্রবর্তী, চিত্তরঞ্জন রায়সহ আরও অনেককে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। প্রায় প্রতিদিন এখানে বাঙালিদের হত্যা করা হতো। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে গণপূর্ত বিভাগের বাস্তবায়নে এই বধ্যভূমি সংস্কার ও সংরক্ষণে দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে বধ্যভূমিতে শহিদদের নামফলকে বধ্যভূমি না লিখে (বদ্ধভূমি) ভুল বানান লেখা হয়েছে।

 

রংপুর শহরের দখিগঞ্জ শ্মশানঘাটে ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাসের দুটি মেস থেকে ১১ জনকে নিয়ে যাওয়া হয়। এই দলে দিনেশ চন্দ্র ভৌমিক মন্টু ডাক্তারের সঙ্গে ছিলেন রংপুরের ভাসানী ন্যাপ নেতা ইয়াকুব মাহফুজ আলী। অলৌকিকভাবে সেই দিন বেঁচে যান মন্টু ডাক্তার। এই বধ্যভূমিতে নামফলক ও শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। তবে শ্মশানের প্রবেশপথের পাশে থাকা স্মৃতিস্তম্ভটি দীর্ঘ দিন ধরে অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে।

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. দিনেশ চন্দ্র ভৌমিক মন্টুর ছেলে সুশান্ত ভৌমিক সুবল বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এসব বধ্যভূমিসহ মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সব স্থাপনা সংরক্ষণে সরকারকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। ৫০ বছরে কোনো দিনও বধ্যভূমিগুলোতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি পালন করা হয়নি। বধ্যভূমি ঘিরে আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

রংপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলু বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর জন্য বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা জরুরি। সরকারের উচিত এমনভাবে বধ্যভূমিগুলোকে সংরক্ষণ করা এবং ফুটিয়ে তোলা, যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বেঁচে থাকে। তানাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা সংগ্রামের কষ্ট-অর্জন অজানা থেকে যাবে।

 

এদিকে বধ্যভূমি এবং গণকবর সংস্কারের জন্য সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে জানিয়েছেন রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান। তিনি বলেন, রংপুরে যেসব বধ্যভূমি এখনও অরক্ষিত রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দমদমা বধ্যভূমি, টাউন হলেরএপছনের বধ্যভূমি, সাহেবগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি বধ্যভূমি সংরক্ষণের কাজ শেষ করা হয়েছে। সেসব বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ ও নামফলক বসানো হয়েছে। বাকিগুলোতেও পর্যায়ক্রেমে দৃশ্যমান হবে।

 

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী মুক্তিকামী বাঙালি ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের ধরে এনে নির্মম নির্যাতন-নিপীড়ন করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। তারই রক্তমাখা নীরব মাটি ও সাক্ষী বধ্যভূমি এবং গণকবরগুলো। আমরা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ সকলে মিলে বধ্যভূমি চিহ্নিত করার পাশাপাশি সব শহিদের নাম সংরক্ষণ করতে চেষ্টা করছি। এই প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *