বুকে গুলি চালানোর আগে মুহিবুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছিল তারা

নজর২৪ ডেস্ক কক্সবাজারের উখিয়া ক্যাম্পের ঘরে ঢুকেই রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহকে গুলি করে হত্যা করেছে ৫-৬ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। গুলি চালানোর আগে মুহিবুল্লাহর সঙ্গে ঘরে বসে কথা বলেছিল তারা। যাওয়ার সময় পাঁচ রাউন্ড গুলি চালায়। এরমধ্যে তিন রাউন্ড গুলি বুকে লাগে মুহিবুল্লাহর।

 

নিজেদের দ্বন্দ্বের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বরত ১৪ নম্বর ‘এপিবিএন’র পুলিশ সুপার নাইমুল হক।

 

বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে উখিয়া কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় ইস্ট-ওয়েস্ট ১ নম্বর ব্লকের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মুহিবুল্লাহ (৫০) মিয়ানমারের রাখাইনের মংডু এলাকার লংডাছড়া গ্রামের মৌলভি ফজল আহমদের ছেলে।

 

পরিবারের বরাত দিয়ে ‘এপিবিএন’র পুলিশ সুপার নাইমুল হক বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা মুহিবুল্লাহকে হত্যা করেছে। সন্ত্রাসীরা মুহিবুল্লাহর ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেছে। তারা ৫-৬ জন ছিল। যাওয়ার সময় গুলি চালায়। খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সদর হাসপাতাল মর্গে তার লাশের ময়নাতদন্ত হবে।’

 

এআরএসপিএইচ-এর সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের নেতাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তাকে হত্যা করায় আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’

কে এই মুহিবুল্লাহ
রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ ১৯৯২ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আসেন। তখন থেকেই টেকনাফ অঞ্চলে অবস্থান নিয়ে নানাভাবে রোহিঙ্গাদের সংগঠিত করতে থাকেন।

 

মুহিবুল্লাহ ২০০০ সালের শুরুতে ১৫ জন সদস্য নিয়ে গড়ে তোলেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটস’ নামের সংগঠন, যা এআরএসপিএইচ নামে বেশি পরিচিত। অন্যদেশের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশি মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গেও গড়ে তোলেন গভীর যোগাযোগ। ধীরে ধীরে মুহিবুল্লাহ হয়ে ওঠেন প্রধান পাঁচ রোহিঙ্গা নেতার একজন।

 

বিদেশিদের কাছে আগে থেকে পরিচিত হলেও ২০১৭ সালে তিনি বনে যান রোহিঙ্গাদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। সে সময় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে তাদের যোগাযোগে ভূমিকা রাখতে থাকেন নিয়মিত।

 

মুহিবুল্লাহ কয়েক দফায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন। তার উত্থানে সহায়ক হয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ২০১৮ সালে ইউএনএইচসিআরকে সংযুক্ত করার ঘটনা।

 

ইংরেজি ভাষা জানা ও রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দক্ষতা মুহিবুল্লাহকে ধীরে ধীরে বিদেশিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিদেশি প্রতিনিধিরা যখনই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গেছেন, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই রোহিঙ্গা প্রতিনিধি হিসেবে মুহিবুল্লাহ যোগ হয়েছেন। তার সঙ্গীদেরকেও প্রতিনিধি করেন।

 

মূলত বিদেশি সংস্থা ও সংগঠনগুলো দেশে ফেরার বিষয়ে যখন রোহিঙ্গাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে তখনই মুহিবুল্লাহর সংগঠন এআরএসপিএইচ ভিন্ন কাজ করেছে। তারা ক্যাম্পে নানা প্রচারনা চালিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করেন এবং প্রত্যাবাসনে বাধার চেষ্টা চালিয়ে যান। কয়েক দফায় বিক্ষোভের আয়োজন করেন।

 

মুহিবুল্লাহ এক পর্যায়ে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংলাপের প্রস্তাব দেন।

 

২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে উখিয়ার কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মহাসমাবেশ করে রোহিঙ্গারা। এ সমাবেশে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা জড়ো হয়। রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে গঠিত এআরএসপিএইচ চেয়ারম্যান রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ সমাবেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তখন আলোচনায় উঠে আসেন।

 

এর আগে একই বছরের ১৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৭ দেশের যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২৭ প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করেছিলেন সেখানেও যোগ দিয়েছিলেন মুহিবুল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *