নাগরপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর হার বেড়েছে

নাগরপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি- স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রতিরোধ আন্দোলনে সংগ্রামরত যোদ্ধাকেই বলা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছে এক একজন স্বাধীন বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাসের সাক্ষী। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে অনেক দূরে।

 

তবে আমরা প্রতিনিয়ত হারিয়ে ফেলছি আমাদের বীর যোদ্ধাদের, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠিত। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় শুধুমাত্র এই বছরে অন্তত ১৯ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা পরলোক গমন করেছেন।

 

নাগরপুর উপজেলাবাসী হারিয়েছে সেইসব বীর যোদ্ধাদের যাদের অগ্রণী ভূমিকা নাগরপুর উপজেলাকে বিখ্যাত করেছে ইতিহাসের পাতায়। উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক জানা যায়, পুরো উপজেলায় মোট মুক্তিযোদ্ধা ছিলো ৮৪২ জন এবং মারা গেছে প্রায় ৩৫০ জন।

 

কথা হয় মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা মুছা মিয়া পরিবারের সাথে, তার সহধর্মীনি নাজনীন আক্তার লাভলী বলেন, আমার স্বামী একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি অন্যায়কে কোনোদিন প্রশ্রয় দেননি। তিনি তৎকালীন নাগরপুর উপজেলার সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে পরিচিত মুখ ছিলেন। তার শূন্যতা এখন আমরা অনুভব করি। তিনিসহ নাগরপুরের সকল মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

 

আরেক মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল হোসেন এর সন্তান শেখ শহিদুল ইসলাম বিপ্লব জানায়, আমার পিতা সহ আমরা এখন পর্যন্ত প্রায় তিন শতাধিকের উপরে মুক্তিযোদ্ধা হারিয়েছি। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ প্রাপ্য সম্মান প্রদান করায় আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

 

নাগরপুর উপজেলা ডেপুটি কামান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ মতিন ছামী আবেগ আপ্লুত হয়ে জানায়, আমাদের অনেক সহযোদ্ধারা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে। বেশিরভাগ বার্ধক্যজনিত কারণেই মারা গেছে। আমি সহ আমরা সকল জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা গভীর শোকাহত।

 

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড নাগরপুর উপজেলা শাখার সভাপতি মো: আজিজুল হক বলেন, অল্প সময়ে আমরা অনেকগুলো জাতির বীর সন্তানদের হারিয়েছি। প্রত্যেক বীর মুক্তিযোদ্ধা এক একজন ইতিহাসের সাক্ষী। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সবসময় শোক পরিবারের পাশে আমরা থাকি এবং প্রত্যেক বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে আমি নিজে উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধার সাথে শেষ বিদায় দিয়েছি।

 

মুক্তিযোদ্ধাদের পরলোক গমন বেড়ে যাওয়া বিষয়ে নাগরপুর উপজেলা সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সুজায়েত হোসেন দুঃখ ভারাক্রান্ত কন্ঠে বলেন, আমাদের টাঙ্গাইল জেলায় প্রায় সাড়ে ৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। এর মধ্যে নাগরপুরে ৮৪২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন শত বীর মুক্তিযোদ্ধা ইতিমধ্যে হারিয়েছি। এরমধ্যে কাদেরিয়া বাহিনীর আনোয়ারুল আলম শহীদ, আব্দুল সবুর খান বীর বিক্রম ও বাতেন বাহিনীর প্রধান খন্দকার আবদুল বাতেন এমপিসহ বেশ সংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইন্তেকাল করেছেন। আমরা সকল পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করছি।

 

একই সাথে সকল জেলা- উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচনের জোর দাবী জানাচ্ছি। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত অবস্থার চিত্র একমাত্র আমরা মুক্তিযোদ্ধারাই তুলে ধরতে পারি এবং তাদের অসুস্থতা ও বিভিন্ন সমস্যায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সহযোগিতা করতে সক্ষম। টাঙ্গাইল জেলায় কাদেরিয়া বাহিনী ও বাতেন বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বংলা প্রতিষ্ঠার আশা ব্যক্ত করছি।

 

নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সিফাত-ই-জাহান শোক জানিয়ে বলেন, নাগরপুর উপজেলাবাসী এই বছরে অনেকগুলো জাতির বীর সন্তানদের হারিয়েছে এবং আমরা উপজেলা প্রশাসন সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে শেষ বিদায় দিয়েছি। মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। তাদের হারিয়ে যে ক্ষতি আমাদের হয়েছে তা অপূরণীয় হয়ে থাকবে।

 

বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া মেনে নিতে হলেও প্রতিনিয়ত নাগরপুর উপজেলাবাসী গভীর শ্রদ্ধাভরেই স্মরণ করছে প্রত্যেক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। প্রত্যেক বীর মুক্তিযোদ্ধা যেনো তাদের প্রাপ্য সম্মান ও শ্রদ্ধা যেনো মরণোত্তর পায় সেটিই কাম্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *