ঝালকাঠির আমড়ার বাম্পার ফলন: দেশের গন্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যেও

মো:নজরুল ইসলাম, ঝালকাঠি: ঝালকাঠি সহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলা গুলোতে চলতি বছরে আমরার বাম্পার ফলন হয়েছে। এখানে উৎপাদিত আমরার সরবরাহ হচ্ছে রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশে। রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও।

 

ধানের চেয়ে বেশি লাভজনক হওয়ায় আমড়া চাষে ঝালকাঠির কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠেছে।এ বছর আমড়ার বাম্পার ফলনে বাড়তি আয়ের প্রত্যাশায় প্রত্যেক বাড়িতে খুশির আমেজ থাকলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চাষিদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

 

কিন্তু হিমাগারের অভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না আমড়া। সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেয়ায় বাগানেই লাখ লাখ টাকার আমড়া পচে নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ চাষিদের। শুরুতে নিজেদেরর পরিবারের চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে আমড়া চাষ করা হয় । অল্প খরচে বেশি উৎপাদন ও অধিক লাভজনক হওয়ায় এখন বাড়তে থাকে আমড়া চাষ । গত কয়েকবছর ধরেই শুরু হয় বানিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ এ জেলায়।

 

ঝালকাঠি সহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই দীর্ঘদিন ধরে নিজ প্রয়োজনে দু’একটি করে আমড়া গাছ লাগানো হতো। লাভ জনক হওয়ায় কয়েক বছর ধরে কৃষি জমিতে কান্দি বা পাইকা কেটে, জমির আইলে,পুকুর পাড়ে,সরকারি রাস্থার ধারে নদী ও খালের পারে বাড়ীর আঙ্গিনায় বানিজ্যিক ভিত্তিতে আমড়া চাষ করে চাষিরা। এখানে উৎপাদিত আমরার চাহিদা এবং জনপ্রিয়তা রয়েছে সারাদেশেই।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশালের আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরে বরিশাল অঞ্চলে দুই হাজার ১২৪ হেক্টর জমিতে আমড়ার চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ১৪ টন আমড়ার ফলন মিলবে। সে হিসাবে বরিশাল বিভাগেই ৩০ হাজার টন আমড়া উৎপাদন হবে। এর বাজারদর কমপক্ষে অর্ধশত কোটি টাকা।

 

সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ফল আমড়া। টক-মিষ্টি স্বাদের ফলটি কমবেশি সবারই প্রিয়। দেশীয় এ ফল নির্দিষ্ট মৌসুমে পাওয়া যায় প্রায় দেশজুড়েই।

 

যত্ন করে আমড়ার সবুজ বাকল ছাড়িয়ে লবণ-মরিচ মিশিয়ে তাতে কাঠি গেঁথে বিক্রির দৃশ্য এ সময়টাতে প্রায় সর্বত্রই চোখে পড়বে। আবার খরু খরু করে তাতে কাসুন্দি মিশিয়ে বিক্রি করতেও দেখা যায় রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে। কোন এলাকার আমড়া? বিক্রেতা হয়তো নিজেও জানে না। তবে এটা জানে যে বরিশাল এলাকায় উৎপাদিত আমড়ার প্রতি ক্রেতা-ভোক্তার আগ্রহ বেশি। সে জন্য রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিক্রেতা ডেকে ওঠে -“এ্যাই আমড়া, বরিশ্যাইল্যা আমড়া”। জবাব শুনে ভোক্তাও তা লুফে নেয় আগ্রহভরে।বাজারে আমড়া বিক্রি হয় কেজি দরে।

 

অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে ঝালকাঠি তথা উপক’লীয় জেলাগুলোর হাজার হাজার আমড়ার চাষীরা আমড়ার ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। প্রতি বছরই তাদের উৎপাদিত ফসল নামমাত্র মূল্যে কিনে নিচ্ছেন পাইকার নামক মধ্যসত্ত্বভোগীরা, বিনা শ্রমে তারা অর্জন করছে বিপুল মুনাফা। চলতি মৌসুমে আমড়ার ফলন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে প্রতিমন আমড়া পাইকারি ৭০০থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর এক কুড়ি (২০টা) আমরা ৫০থেকে ৬০ টাকা বিক্রি হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে গড়ে ৫মন আমড়া পাওয়া যায় যা দিয়ে একর প্রতি কমপক্ষে ৪-৫ লাখ টাকা আয় হয়।

 

আমড়া চাষের জন্য এ অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু বেশ উপযোগী। তাই আমড়ার ফলনও এ অঞ্চলে বেশি হয়ে থাকে। কৃষকরা আমড়া চাষ করে অতি সহজে হতে পারেন স্বাবলম্বী। এছাড়া মৌসুমি ফল আমড়া হতে পারে এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস।

 

কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে মোট উৎপাদিত আমড়ার এক-তৃতীয়াংশের আবাদ হয় বরিশাল অঞ্চলে। আর এ অঞ্চলের উৎপাদিত সিংহভাগ আমড়ার আবাদ হয় বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনাসহ প্রতিটি জেলার আনাচে-কানাচে।

 

ঝালকাঠি কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগ সুত্র জানিয়েছে, চলতি বছর জেলায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে আমড়া চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৮ থেকে ১০ টন আমড়া উৎপাদন হয়েছে।

 

ঝালকাঠির আমড়ার অন্যতম মোকাম ঝালকাঠির বাউকাঠি ও ভীমরুলির ভাসমান বাজার। এ ছাড়া পিরোজপুরের আটগড়, কুড়িয়ানা, বরিশালের বানরীপাড়াসহ ছোট-বড় প্রায় ২০টি বাজারে আমড়ার বেচাকেনা হয়। এসব বাজার থেকে নৌ-পথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমড়ার চালান করা হয়। এসব বাগানে প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকার আমড়ার উৎপাদিত হয়।এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা আমড়ার, পেয়ারা ও সবজি নির্ভর।

 

ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা গ্রামের বেশিরভাগ এলাকায় আমড়া কেনা-বেচার ব্যাপারী রয়েছেন। তারা আগাম টাকা দিয়ে বাগান কিনে নিয়েছেন।

 

বর্তমানে এত বেশি আমড়ার ফলন হচ্ছে, যা দেশ-বিদেশে চালানের পরও পর্যাপ্ত মজুদ থাকছে। অথচ হিমাগারের অভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। যে কারণে আড়তদারদের চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম মূল্যে আমড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা।

 

উপজেলার আমড়া ব্যবসায়ীরা জানান, এ মোকাম থেকে বছরের চার মাস অর্থাৎ আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক কোটি টাকার আমড়া চালান দেয়া হয়। ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, যশোর, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, নোয়াখালী ছাড়াও এখন দেশের বাইরে ভারত, দুবাই, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ডসহ রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও।

 

তবে চৈত্র-বৈশাখ মাসে গৃহস্থদের অগ্রিম টাকা দিয়েআমড়ার গাছ কিনে থাকেন। শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত তারা পর্যায়ক্রমে গাছ থেকে আমড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করেন।

 

পুরোপুরি নিজস্ব মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে এ এলাকার কৃষকরা আমড়ার চাষ করে দেশের উন্নয়নে অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি আমড়ার চাষে কৃষকদের আগ্রহ সৃষ্টি করা গেলে এ অঞ্চলের কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে।সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পতিত জমিতে বেশি বেশি আমড়া গাছ লাগালে অরো বেশি পুষ্টি সহায়ক এবং গ্রমীন অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে বলে জনান কৃষিবিদরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *