মুখ খুলেছেন মাহমুদ হাসান গুনবী, জানা গেল জঙ্গিবাদে জড়ানোর আদ্যোপান্ত

নজর২৪ ডেস্ক- বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে অংশ নিয়ে তার আড়ালে এবং বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের প্রচারণা এবং জঙ্গিদের রিক্রুট করতো দাওয়াত-ই ইসলাম নামক ইসলামী সংগঠনের সভাপতি ও নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা মাহমুদ হাসান গুনবী ওরফে হাসান।

 

১০ দিন আগে নোয়াখালী থেকে তুলে আনার অভিযোগ থাকা এই ধর্মীয় বক্তাকে বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। র‌্যাবের দাবি, গ্রেফতারকৃত মাহমুদ হাসান গুনবী ওরফে হাসান মানুষকে এতটাই মোটিভেট করতে পারত যে, যে কেউ তাদের মতাদর্শে জড়িয়ে পড়তে কোন পিছপা হতো না।

 

শুক্রবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর কাওরান বাজারে মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, অনেককেই নিজের মোটিভেশনাল শক্তির মাধ্যমে অন্য ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতো সে। যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতো তাদের ভেতরে নানা ধরনের অনুশোচনাবোধ জাগিয়ে তুলতো এবং জঙ্গিবাদের বিভিন্ন মতাদর্শ তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতো। উগ্রবাদী বক্তব্যের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিতো গুনবী। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলের অংশ নিয়ে তার মোটিভেশনাল পাওয়ারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক বোধ জাগিয়ে তুলতো।

 

খন্দকার আল মঈন বলেন,  ‘দাওয়াতে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এসব সংগঠনের আড়ালে তরুণদের টার্গেট করতেন তিনি (গুনবী)। এরপর তাদের পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে পরিবার, স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো। এবং এই সময়ে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, স্বাভাবিক জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করে এসব তরুণদের জঙ্গিতে পরিণত করতেন।’

 

বিভিন্ন ওয়াজে বক্তব্যের মাধ্যমে গুনবী তরুণদের উগ্রবাদে আকৃষ্ট করতেন বলেও জানান র‌্যাব কর্মকর্তা। বলেন, তার মতো যারা মানুষকে আকৃষ্ট করে আসছিল তারা নিজেদের ‘মানহাজী’ বলে পরিচয় দিত।

 

গুনবীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পারার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

র‌্যাব জানিয়েছে, গুনবী পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়াশোনার পর মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ২০০৮ সালে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া থেকে তাইসির দাওরায়ে হাদিস শেষ করেন। এরপর ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সজারের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি ধর্মীয় মতাদর্শের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হন।

 

২০১০ সাল থেকে তিনি ওয়াজ মাহফিল শুরু করেন। ২০১৪ সাল থেকে ধর্মীয় বক্তব্যে উগ্রবাদ প্রচার শুরু করেন। তিনি ধর্মীয় পুস্তকের ব্যবসাতেও জড়িত ছিলেন।

 

জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদে যোগ

র‌্যাব জানায়, গুনবী প্রথমে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশে যুক্ত ছিলেন। পরে আধ্যাত্মিক জঙ্গি নেতা জসিম উদ্দিন রহমানীর সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। এরপর আনসার আল বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি।

 

রাহমানী গ্রেপ্তারের পর উগ্রবাদের প্রচার শুরু করেন গুনবী। তিনি আনসার আল ইসলামের দাওয়াত ও প্রশিক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মাদ্রাসায় খণ্ডকালীন বা অতিথি বক্তা হিসেবে দীর্ঘ মেয়াদী শিক্ষকতা ও মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এসব মাদ্রাসায় সম্পৃক্ত হয়ে তিনি জঙ্গিবাদের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন।

 

তরুণদের জঙ্গিদে জড়াতেন যেভাবে

র‌্যাব বলছে, সাধারণ জঙ্গিদের তিনি আত্মঘাতী হতে উদ্বুদ্ধ করতে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে ভূমিকা পালন রাখতেন। আনসার আল ইসলামের (এবিটি) অন্যতম একজন দর্শন পরিবর্তনকারীও তিনি।

 

দর্শন পরিবর্তনের কৌশল সম্পর্কে গুনবী র‌্যাবকে জানিয়েছেন, গোপন আস্থানায় বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মঘাতী হিসেবে তিনি এই কৌশল কাজে লাগাতেন। যেখানে প্রশিক্ষণার্থীদের আত্মীয়-স্বজন, পরিবার বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি বাইরের জীবন, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান থেকে দূরে রাখতেন।

 

এরপরই প্রশিক্ষণার্থীদের মস্তিস্কে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ভয়ভীতি তৈরি ও স্বাভাবিক জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা জাগ্রত করা হতো। এভাবে তাদের নৃশংস জঙ্গি হিসেবে গড়ে তুলতেন।

 

‘গুনবীর কথা শুনে আত্মঘাতী’

গত ৫ মে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসা সন্দেহভাজন জঙ্গি আল সাকিব গ্রেপ্তার হন। তিনি সংসদ ভবনে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

 

সাকিব গুনবীর মাধ্যমে আত্মঘাতী হয়েছিলেন বলে দাবি করেছে র‌্যাব।

 

গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপন, দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা

মে মাসের প্রথম দিকে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল গুনবী। কুমিল্লা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে গিয়ে দুগর্ম এলাকায় আত্মগোপন করেন। জুনের শেষের দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর তিনি বান্দরবান চলে যান। সেখানে দুই-তিনদিন অবস্থান করেন।

 

পরবর্তীতে সে লক্ষ্মীপুরের চর গজারিয়া ও চর রমিজে ঘনঘন স্থান পরিবর্তন করে বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত করেন। আবারও সে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা টের পেয়ে ওই স্থানও ত্যাগ করেন। অতঃপর তিনি উত্তরবঙ্গে আত্মগোপন করে প্রয়োজনে দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *