ঢাকা    ৫ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



সমালোচনার মুখে একদিনের মাথায় সিন্ধান্ত পাল্টাল অপো

প্রকাশিত: ১০:৪৮ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২১

সমালোচনার মুখে একদিনের মাথায় সিন্ধান্ত পাল্টাল অপো

নজর২৪ ডেস্ক- আট দিন নিখোঁজ হয়ে তুমুল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা ধর্মীয় বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের বন্ধু সিয়াম ইবনে শরীফকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি বলে জানিয়েছে তার নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান।

 

সিয়ামকে চাকরি থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল সমালোচনা তৈরি হলে নতুন ব্যাখ্যা দেয় মোবাইল ফোন বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান অপো। এখন তারা বলছে, সিয়ামকে হোম অফিস করতে বলা হয়েছে। অফিসে আসতে নিষেধ করা হয়েছে তার নিরাপত্তার কথা ভেবে।

 

সিয়াম রংপুর মুন্সিপাড়ায় অফিসের কো-অর্ডিনেটর (এইচআর) পদে চাকরি করতেন। রোববার তাকে সেই পদ থেকে অব্যাহতির কথা জানানো হয় বলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান।

 

ত্ব-হা আত্মগোপনে যাওয়ায় সিয়ামের চাকরি কেন যাবে- এই নিয়ে প্রশ্নের মুখে সোমবারই বক্তব্য পাল্টে যায় তাকে অব্যাহতির কথা জানানো অপো কর্মকর্তার।

 

সিয়ামকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টি জানিয়েছিলেন অপোর রংপুর আঞ্চলিক প্রধান সাইফুল ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমের কাছেও একই বক্তব্য দেন।

 

বক্তব্য পাল্টালেন অপো কর্মকর্তা

 

তবে পরদিন তিনি নলেন, ‘না, ওর চাকরি যায়নি। এটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, এখানে জয়েন করাও যেমন সহজ না, তেমনি চাকরি থেকে বাদ দেয়াও সহজ না। বাদ দিলে তো তার একটা টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন আছে।

 

‘কারও যদি কোনো পারসোনাল ইস্যুতে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সমস্যা ইনস্ট্যান্ট দেখা দেয়, সেই ক্ষেত্রে তার সেইফটি এবং আমাদের সেইফটির জন্য আমরা তাকে আপাতত বলতে পারি, আপাতত তুমি হোম অফিস করো বা আপাতত কন্টিনিউ করার দরকার নাই, প্রবলেম সলভ করো, তারপর গিয়ে অফিসে যোগাযোগ করো।’

 

কিন্তু সিয়াম জানিয়েছেন, তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আপনিও আগের দিন তাই বলেছেন- এমন প্রশ্নে সাইফুল বলেন, ‘এটা আমার রিজিওনাল অফিস, আমার হেডকোয়ার্টার আছে। আমি বলেছি, তুমি আপাতত কন্টিনিউ করো না, তুমি সেইফ জোনে থাকো, আমরা আমি হাই অথরিটির সঙ্গে কথা বলে তারপর তোমাকে জানাচ্ছি।’

 

তিনি আরও বলেন ‘তাকে (সিয়াম) চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে মানে তাকে অফিশিয়ালি ডাকা হবে, জানানো হবে। তাই না? এটা তো একটা প্রসিডিউর আছে।’

 

‘সব সিয়ামের নিরাপত্তার জন্য’

 

নিজের আগের দিনের কথা আবার স্মরণ করালে সাইফুল বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় নিউজ হয়েছে, আমার খুব খারাপ লাগছে।… চাকরি নাই, এটা টোটালি একটা ফালতু কথা। তার সেইফটির জন্য আপাতত তাকে বারণ করা হয়েছে।

 

‘একটা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সে কারণে হোম অফিস করতে বলা হয়েছে।’

 

‘সে যদি দোষী না হয়, তাহলে তাকে কেন টার্মিনেট করা হবে, তার চাকরি কেন যাবে?’- পাল্টা প্রশ্নও করেন সাইফুল।’

 

দাবি, এসএমএস নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে

 

তাহলে সিয়ামকে কেন হোম অফিস করতে বলা আর অফিসের বিভিন্ন গ্রুপ থেকে কেন বাদ দেয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নে অপো কর্মকর্তা সরাসরি জবাব দেননি। বলেন, ‘সে আমাদের এখানে তিন মাস চাকরি করছে। সে খুবই ভালো ছেলে । আমি তাকে রিকোয়েস্ট করেছি। আমি তার রিক্রুটিং বস..। সে খুবই বিশ্বস্ত। বিষয়টি তার পারসোনাল ইস্যু। এটা সলভ করতে বলা হয়েছে। এতে আমার তার, কোম্পানির ইমেজের জন্য বেটার।’

 

কিন্তু আপনার এসএমএসও তো ছিল চাকরি থেকে বাদ দেয়ার- এমন মন্তব্যের পর সাইফুল বলেন, “কিছু সাংবাদিক এসে আমাকে বলছেন, ওই ঘটনার সঙ্গে সে জড়িত। তার বাসায় ত্ব-হা ছিল। ‘তখন আমি বলি, হাউ ইট পসিবল?’ তখন অনেক মিডিয়ার লোকজন আসা শুরু করল। তখন আমি বলি, আমার সঙ্গে আপাতত কন্টিনিউ করার দরকার নেই। মেসেজের এটাই অর্থ ছিল।

 

“বলেছি, ভাই তুমি আগে নিজে সেইফে থাকো। দ্যাট নট মিনস দ্যাট। তাকে বলা হয়নি ইউ আর ফায়ার্ড। তার মানে তার চাকরি থেকে টার্মিনেট করা হয়নি। তার পরিবারের সেইফটির জন্য তাকে বাসায় থাকতে বলা হয়েছে। অফিস থেকে বলা হচ্ছে তুমি বাসায় চলে যাও।”

 

বিষয়টি নিয়ে সিয়াম ভুল বুঝেছেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমার হায়ার অথরিটি বলছে যে, এটা তো তার পারসোনাল ইস্যু। যদি সে অপরাধী প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে আমরা সাসপেন্ড করব। আর যদি প্রমাণিত না হয় তাহলে সে কন্টিনিউ করবে। হয়তো মিস আন্ডারস্টান্ডিং হয়েছে। কমিউনিকেশনে ভুল হচ্ছে। হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে।’

 

গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এখন দায় দিচ্ছেন অপো কর্মকর্তা। বলেন, ‘সাংবাদিকরা আমার ওপর দোষ চাপাচ্ছে, আমাকে অপরাধী বানাচ্ছে। তার (সিয়াম) একটা ১০ মাসের বাচ্চা রয়েছে, বাড়িতে তার মা ছাড়া কেউ নেই। এই আসা-যাওয়ার ভেতরে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তার দায়ভার কে নেবে বলেন…।’

 

সিয়াম তাহলে কবে থেকে অফিস করতে পারবেন?- সাইফুল বলেন, ‘যেহেতু তার একটা পারসোনাল প্রবলেম হয়েছে, সেটি সলভ হয়ে গেলে অফিস কন্টিনিউ করতে পারবে। আমি সেটা বলেছি।

 

প্রসঙ্গত, গত ১০ জুন ইসলামি বক্তা হিসেবে পরিচিত আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান নিখোঁজ হন বলে পরিবার দাবি করে। এ ঘটনায় রংপুর কোতয়ালি থানায় একটি জিডি করা হয়। তার সন্ধানের দাবিতে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করেন বন্ধু-স্বজনসহ সাধারণ মানুষ।

 

বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত হয়। নিখোঁজের আট দিন পর শুক্রবার দুপুরে তার দুই সঙ্গীসহ রংপুর নগরীর চারতলা এলাকায় মাস্টারপাড়া মহল্লায় শ্বশুর আজহারুল ইসলামের বাড়িতে আসেন তিনি।

 

খবর পেয়ে কোতয়ালি থানার পুলিশ আবু ত্ব-হা আদনানসহ তিনজনকে নগরীর সেন্ট্রাল রোডে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদে আবু ত্ব-হা আদনান জানান তিনি স্বেচ্ছায় গাইবান্ধার ত্রিমোহনীতে বন্ধু সিয়ামের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন।

 

যদিও এ বিষয়ে সিয়াম কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেন। রোববার (২০ জুন) সিয়াম বলেন, আবু ত্ব-হা আদনান তার বাল্যকালের বন্ধু। তারা একসঙ্গে স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছেন। কিন্তু তাদের গাইবান্ধার ত্রিমোহনীর বাড়িতে তিন সহযোগীসহ আদনানের আত্মগোপনে থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন না। চাকরির কারণে রংপুরে অবস্থান করায় বিষয়টি সম্পর্কে বাড়ি থেকে তার মা কিছুই জানাননি।

 

তিনি বলেন, ‘আমি অপো কোম্পানির রংপুর মুন্সিপাড়া অফিসে কো-অর্ডিনেটর (এইচআর) পদে চাকরি করতাম। আজ (রোববার) লাঞ্চে যাওয়ার পর কিছু সাংবাদিক আমার অফিসে আসেন। আমার খোঁজ করেন।

 

‘তারা ত্ব-হার নিখোঁজের বিষয়ে আমার সম্পৃক্ততা আছে বলে দাবি করেন। এ কারণে আমার অফিস আমাকে অব্যাহতি দিয়েছে।’

 

সিয়ামের ১০ মাসের একটি শিশুসন্তান রয়েছে। চাকরি হারানোর কথা শুনে মনটা ভীষণ খারাপ। বিশেষ করে শিশুসন্তানকে নিয়ে এখন কী করবেন, ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। এসব কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে তাঁর।

 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিয়াম বলেন, আমার কোনো অপরাধ নেই। অথচ ত্ব-হা আমার বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা এবং আমি তার (ত্ব-হার) সন্ধান চেয়ে মানববন্ধনে অংশ নিয়েছিলাম বলেই চাকরিটা হারালাম। আল্লাহ বিচার করবে, আমি সত্যি কিছু জানতাম না।