নজর২৪ ডেস্ক- যে আসামির জামিন আবেদন একাধিকবার নাকচ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট, সেই আসামিকেই অনেকটা গোপনে জামিন দিয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ইকবাল হোসেনের ভার্চুয়াল আদালত। ইতোমধ্যে কাশিমপুর কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন বরখাস্ত হওয়া সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সেই আসামি ডিআইজি প্রিজন্স পার্থ গোপাল বণিক।
অর্থপাচার ও ঘুষ গ্রহণ মামলায় রাজধানীর ধানমণ্ডির ভূতের গলির বাসা থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করে দুদক। এরপর একাধিকবার হাইকোর্ট জামিন চান সাবেক এই কারা কর্মকর্তা। তবে সেই আবেদনে সাড়া না দিয়ে মামলাটি ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন আদালত।
তবে গত বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে জামিন চাইতে আসেন পার্থ। দুপক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আদেশ পরে দেবেন বলে জানান। কিন্তু ওই দিন রাত সাড়ে ৮ টায় তার জামিন আদেশ পৌঁছে যায় কেন্দ্রীয় কারাগারে। অথচ এ মামলায় দুদকের প্রধান কৌশলি জামিন আদেশ জানতে পারেন রাত ৯ টায়।
মামলা নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টের নির্দেশনায় মনোযোগের বদলে দ্রুত এমন জামিন আদেশকে নজিরবিহীন বলছেন আইনজীবীরা।
দুদক আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় শুনেছি পার্থ গোপালের জামিন হয়েছে। জামিন হয়ে গেলেতো বের হতে বাধা নেই।
পার্থ গোপালের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলছেন, আদালত সবকিছু নিয়ে বলেছে অর্ডারটা দিবো। এরপর আমি তাড়াতাড়ি চলে আসি। পরবর্তীতে শুনেছি তাকে মনে হয় জামিন দিয়েছে।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মীর আহমেদ আলী সালাম জানান, উচ্চা আদালতের নির্দেশনাটা বাধ্যতামূলক নিচের আদালতের জন্যে। সেখানে নিম্ন আদালত জামিন দেওয়াটা একটু অন্যরকম।
এদিকে সাবেক ডিআইজি পার্থ গোপালের অস্বাভাবিক জামিনের ঘটনায় দুদকের পদক্ষেপ জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। রোববার (২০ জুন) তার জামিনের বিষয়টি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের নজরে আনা হয়।
এ সময় আদালত বলেন, তারা বিষয়টি জানেন না। যেহেতু মামলাটি দুদকের তাই তাদের পদক্ষেপ জানা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন।
এদিকে পার্থ গোপাল বণিকের জামিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আপিল করবে বলে জানিয়েছেন দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার।
দুদক সচিব বলেন, ‘নিম্ন আদালতে পার্থ গোপাল বণিকের জামিন হওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। তার বিরুদ্ধে বিচারের শুনানি চলমান রয়েছে। তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষের দিকে আছে। এই অবস্থায় তার জামিন হয়েছে। আমরা উচ্চ আদালতে জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করব।’
এর আগে ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই কারাগারের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পার্থ গোপাল বণিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তাকে নিয়ে অভিযানে যায় দুদক। এ সময় রাজধানীর ভূতেরগলিতে পার্থ গোপালের ফ্ল্যাট থেকে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করে দুদক। এরপরেই তাকে আটক করা হয়। পরদিন ২৯ জুলাই তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪ (২) ধারায় দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলা দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন।
দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, বরখাস্ত হওয়া কারা উপ-মহাপরিদর্শক পার্থ গোপাল বণিক সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে ৮০ লাখ টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন।
এতে আরও বলা হয়, এসব টাকা গোপন করে তার নামীয় কোনো ব্যাংক হিসাবে জমা না রেখে বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে বাসস্থানে লুকিয়ে রেখে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
জানা যায়, সিলেটে দায়িত্ব পালনের আগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দায়িত্ব পালন করেন পার্থ গোপাল বণিক। চট্টগ্রাম কারাগারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাকে এবং চট্টগ্রামের সাবেক সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। তারপরই অভিযানে নেমে পার্থের বাসা থেকে ওই টাকা জব্দ করে সংস্থাটি।
পরে ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে পার্থ গোপাল বণিককে গ্রেফতারের দিন থেকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
