নজর২৪, গাইবান্ধা- গত কয়েক দিনে ব্যাপক আলোচিত ক্রিকেটার থেকে ইসলামি বক্তা বনে যাওয়া আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান তার তিন সঙ্গীসহ গাইবান্ধায় আত্মগোপনে ছিলেন। সেখানে সাত দিন অবস্থানের পর শুক্রবার (১৮ জুন) সকালে তারা রংপুরে চলে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের পশ্চিম পেয়ারাপুর গ্রামের বন্ধু ছিয়াম ইবনে শরীফের বাসায় আবু ত্ব-হা তার সঙ্গীদের নিয়ে আত্মগোপনে থাকেন।
তবে ছিয়ামের মা নিশাদ নাহার বলেন, ত্ব-হা ও তার সঙ্গীরা সাত দিন এই বাড়িতে থাকলেও আশপাশের কেউ জানত না। এমনকি তার ছেলে ছিয়ামও বিষয়টি জানতেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
জানা যায়, বাড়িটিতে একাই থাকেন সিয়ামের মা নিশাত নাহার। গৃহকর্তা শরীফ খান বছর দুয়েক আগে মারা গেছেন। তিনি ছিলেন ব্যাংকার। সিয়াম রংপুর শহরে একটি প্রতিষ্ঠানে এইচআর বিভাগে চাকরি করেন। তার বোনের বিয়ে হয়েছে ঢাকায়।
আরও পড়ুন-
আবূ ত্ব-হার দ্বিতীয় বিয়ে গোপনে, নিখোঁজ হওয়ার আগে জানত না কেউ!
মুখ খুলছেন না আবু ত্ব-হা, পরিবার বলছে ‘অসুস্থ’
ত্ব-হা তার তিন সঙ্গীকে নিয়ে বাড়িতে যাওয়া, আট দিন অবস্থান আর ফিরে আসার পুরো কাহিনি নিশাতের কাছ থেকে জেনেছে গণমাধ্যম।
তিনি জানান, বিষয়টি ছেলে সিয়ামকেও জানাননি নিশাত। কারণ, ত্ব-হা এসেই জানিয়েছিলেন তিনি বিপাকে আছেন। তাকে ফলো করছেন দুজন। বিষয়টি নিয়ে জানাজানি হলে তার বিপদ হতে পারে।

এই সাতটি দিন ঘরে বই পড়েই সময় কাটাতেন ত্ব-হা ও তার তিন সঙ্গী। আর শুক্রবার (১৮ জুন) বেলা ১১টার দিকে ত্ব-হা ও তার তিন সঙ্গী বাড়ি ফেরার কথা বলে চলে যান।
সিয়াম-ত্ব-হার বন্ধুত্ব
বাড়ির সামনে ও পেছনে দুটি লোহার গেট আছে। শনিবার বেলা ২টার দিকে গেটে নক করলে দরজা খুলে দেন নিশাত নিজেই। বসতে দেন ড্রয়িংরুমে। এরপর ঘণ্টাখানেক সময় দেন।
নিশাত জানান, সিয়াম ও ত্ব-হা একেবারে শৈশব থেকে বন্ধু। কিন্ডারগার্টেন থেকে এইচএসসি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছেন রংপুরে। তখন সিয়ামরা রংপুরে ভাড়া থাকতেন।
ত্ব-হার মা আজেদা বেগম ও সিয়ামের মা নিশাত নাহার রংপুরে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল দিয়েছিলেন। সেখানে শিক্ষকতা করেছেন নিশাত। তবে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। আর বছর পাঁচেক আগে তারা গাইবন্ধায় ফিরে আসেন।
তারা গাইবান্ধায় চলে আসার পর ত্ব-হা একাধিকবার এসেছেন বাড়িটিতে; কখনও সিয়ামের সঙ্গে, কখনও এসেছেন একাই।
এক ফাঁকে নিশাত জানিয়ে রাখেন, ত্ব-হাকে ছোটবেলা থেকেই তিনি আদর করতেন। ছেলের মতোই দেখতেন। আর তার কাছে আবদারও করতেন ত্ব-হা।
সিয়ামের মায়ের সঙ্গে কথোপকথন
-ত্ব-হা কখন আসলেন এবং এসে কী বলেছেন?
সিয়ামের মা বললেন, ‘শুক্রবার ও (ত্ব-হা) হুট করেই আসছে। আগে কিছুই জানায়নি। সঙ্গে ছিল আরও তিনজন। সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ ছিল। পরে বলে যে, কে জানি ওদের ফলো করতেছে। এটা বলার পর কয়েক দিন এখানে থাকতে চায়! আমি আর না করতে পারিনি।’
এক প্রশ্নে নিশাত জানিয়ে দেন, তাদের অন্তর্ধান নিয়ে দেশজুড়ে যে তোলপাড়, সেটি বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত জানতে পারেননি। সেই রাতে তার মেয়ে ফোন করে ত্ব-হার বিষয়টি জানিয়েছেন।
তবে তারা যে এই বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, সেটি জানতেন না সিয়ামের বোন। আর মেয়ের কাছ থেকে জানতে পেরে নিশাত ত্ব-হাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন।
নিশাত জানান, তিনি ত্ব-হাকে বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, ‘তোমার তো বিপদ কেটে গেছে। তোমার সঙ্গে মিডিয়া আছে। তুমি তাহলে কাল সকালে বাড়িতে যাও। তোমার আর কোনো সমস্যা নাই।’ তখন তারা শুক্রবার সকালে ফিরে যান।
-ওরা চলে যাওয়ার সময় কী বলেছে?
‘ওরা শুধু বলেছে, আমরা বাড়িতে গেলাম।’
-এত তোলপাড় হওয়া ঘটনাটি নিয়ে মেয়ে ফোন করার আগ পর্যন্ত জানতেন না কিছুই?
‘না, আমি এটা জানি না। ঘরে টেলিভিশন নষ্ট।’
বাড়িতে পত্রিকাও রাখা হয় না আর স্মার্টফোনও চালান না নিশাত।
-কিন্তু তারা আট দিন থাকল, কেউ জানল না, এমনকি আপনার ছেলেও জানে না। এটা কেমন কথা?
‘ওরা (ত্ব-হা) বলতে নিষেধ করেছিল। তাই কাউকে বলিনি।’
-এই আট দিনে তারা কি বাড়ির বাইরে যাননি কেউ? ওদের জন্য তো বাজার-সদাইও করতে হয়েছে, সেটা কে করে দিয়েছে?
‘বাজারঘাট করাই ছিল ফ্রিজে। যা যা ছিল তাই খাওয়াইছি। নিজে যা খাই, তাই খাওয়াইছি।’
-ওনারা এখানে থাকা অবস্থায় কোনো মিটিং হয়েছে কি না, তারা ফোনে কাউকে জানিয়েছেন কি না বা বাইরে থেকে কেউ এসেছেন কি না।
‘তারা এখানে আসার পর থেকে সবাই ফোন বন্ধ করে রাখছে। বাড়ি থেকে বের হয় নাই। বাইর থেকে কেই আসেও নাই এখানে।’
-ত্ব-হা এবারই কি প্রথম এসেছেন?
‘না, এর আগেও ও (ত্ব-হা) অনেকবার আসছিল। এসে এসে থাকত।’
-ত্ব-হাকে রাখলেন ঠিক আছে, কিন্তু অপরিচিত লোকদের কেন রাখলেন?
‘সে বলেছে তার বন্ধু হয়। তাই। তা ছাড়া সে তো এর আগেও বহুবার এখানে থাকছে।’
-ত্ব-হা এর আগে সিয়ামের সঙ্গে এসেছিল নাকি তাকে ছাড়া?
‘তার (সিয়াম) উপস্থিতিতেও আসছিল, অনুপস্থিতিতেও আসছিল।
-আগে যে আসত, কয়দিন ধরে থাকত, কী করত?
‘সর্বোচ্চ থাকছিল ছয় দিন। তখন মসজিদে মসজিদে খুতবা দিত।’
-এলাকাবাসী এবার জানল না, কিন্তু এর আগে যে এসেছে, তখন তো চলাফেরা করেছে। এলাকাবাসী কীভাবে তাকে দেখে?
‘তারা তো তাকে হুজুর হিসেবে চেনে। সবাই তাকে ভালো লোক হিসেবেই দেখে।’
-যদি এরা কোনো অপকর্ম করত, দায়ভার আপনার ওপর তো পড়তে পারত, এমনকি আপনার ছেলের ওপরেও।
‘ওই যে বলেছে, দুজন লোক তাদের ফলো করছে, এ কারণে আমি সরল বিশ্বাসে তাদের থাকতে দিছি। আমি ত্ব-হার মায়ের মতো। ছোটবেলা থেকে আদরযত্ন করে তাকেও তো বড় করছি। যদি আমার ছেলে ২/৪/৫টা বন্ধু নিয়ে এসে বলত, তারা বিপদে পড়েছে, আমি কি তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিতাম?
এর আগে ত্ব-হাকে উদ্ধারের পর ডিবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপকমিশনার (অপরাধ) আবু মারুফ হোসেন বলেন, ১০ জুন রংপুর থেকে ঢাকার পথে রওনা হন আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানসহ আব্দুল মুহিত, ফিরোজ আলম ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন। ঢাকার গাবতলী পৌঁছালে ত্ব-হার ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে সেখান থেকে আবার গাইবান্ধার ত্রিমোহনীতে চলে যান তারা। সেখানে পূর্বপরিচিত বন্ধু ছিয়ামের বাড়িতে অবস্থান করেন। এ সময় বন্ধু ছিয়াম বাসায় ছিলেন না।
উল্লেখ্য, রংপুরে ওয়াজ মাহফিল শেষে ঢাকার বাসায় ফেরার পথে আবু ত্ব-হাসহ চারজন নিখোঁজ হন বলে অভিযোগ ওঠে। আবু ত্ব-হার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঢাকার গাবতলী থেকে তারা নিখোঁজ হন। এ সময় ত্ব-হার সঙ্গে ছিলেন আরও তিনজন। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
১০ জুন থেকে নিখোঁজ আবু ত্ব-হা শুক্রবার জুমার নামাজের আগে রংপুর নগরির চারতলা এলাকায় তার প্রথমপক্ষের শ্বশুর বাড়িতে ফিরে আসেন বলে জানান ত্ব-হার স্বজনেরা। খবর পেয়ে বেলা ৩ টার দিকে পু্লিশ ওই বাড়ি থেকে আদনানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়।
পরে তাকে মহানগর পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখান থেকে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ত্ব-হা ও তার দুই সঙ্গীকে আদালতে নেয়া হয়। মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক কেএম হাফিজুর রহমানের আদালতে জবানবন্দি দেন তারা।
জবানবন্দি শেষে আইনজীবী সোলায়মান আহমেদ সিদ্দিকী বাবুর জিম্মায় রাত ১১টার দিকে তারা বাড়ি ফেরেন।
তবে বাড়ি ফেরার সময়েও নীরব ছিলেন আলোচিত আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান। মুখ খুলেননি তার সঙ্গী আব্দুল মুকিত ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন ফয়েজ। এ সময় তারা সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি।
আরও পড়ুন-
আবু ত্ব-হা কিভাবে ফিরলেন? পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেন দুই প্রত্যক্ষদর্শী
নজর২৪ ডেস্ক- ইসলামি বক্তা মো. আফছানুল আদনানের (আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান) খোঁজ পাওয়া গেছে। আজ (১৮ জুন) বিকেল ৩টার দিকে রংপুর শহরে আবহাওয়া অফিসের মাস্টারপাড়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকে আবু ত্ব-হাকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
তার শ্বশুরের নাম আজহারুল ইসলাম। ত্ব-হা বিয়ে করেছেন দুটি। আজহারুল তার প্রথম স্ত্রীর বাবা।

শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে ত্ব-হা সেই বাড়িতে ফেরেন। আর তার সেখানে ফেরার সময় দেখেছেন স্থানীয় দুই বাসিন্দা বিপ্লব মিয়া ও মো. খোকন। তাদের সঙ্গে কথা বলেছে গণমাধ্যম।
বিপ্লব মিয়া বলেন, ‘একাই ঢুকছিল।’
ত্ব-হা তখন কোন পোশাকে ছিলেন, তার বর্ণনা দিয়ে বিপ্লব বলেন, ‘খালি শুধু একটা হাফ হাতা গেঞ্জি আর পায়জামাটা আর মাস্ক পরা ছিল। আর কোনো কিছু ছিল না।’
ত্ব-হাকে বিল্পব যখন দেখেন, তখন বেলা সাড়ে ১২টা।
বিপ্লব ওই এলাকারই বাসিন্দা।
ত্ব-হার শ্বশুর বাড়ি ঢুকেন পেছনের দরজা দিয়ে।
বিপ্লব বলেন, ‘সাড়ে ১২টার দিকে এখানে নামি আমার গলির দিকে আসছে। ওনার বাড়ির পেছনে একটা দরজা আছে। পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকছে।’
কার বাড়িতে ঢুকল?
‘শ্বশুর বাড়ি।’
শ্বশুরের নাম কী?
‘শ্বশুরের নাম মণ্ডল।’
ত্ব-হাকে দেখে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মো. খোকন। তিনি তার শ্বশুর বাড়ি পর্যন্ত যান।
জানান, ত্ব-হাকে দেখে তিনি যখন প্রশ্ন করেন, তখন জবাব পান- ‘এখন কিছু বলতে পারব না।’
খোকন বলেন, ‘আমি দেখলাম আমার বাড়ির সামনে দিয়া আসতেছে। তখন আমি কামের মধ্যে ছিলাম। তাকে বললাম, কী ব্যাপার, আপনি এদিক থেকে যাইতেছেন?’
মুখে আঙ্গুল রেখে ত্ব-হা কী ইশারা করেছেন, সেটি বুঝিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন তিনি বলেন, চুপ কর, চুপ কর। কোনো কথা হবে না। পরে আলাপ হবে।
‘এই কথা বলে, তখন তিনি চলে গেলেন।’
সেখানে থেমে না থেকে উৎসুক হয়ে ওঠা খোকন চলে যান ত্ব-হার শ্বশুরবাড়ি। তবে সেখানে গিয়েও তিনি তার প্রশ্নের জবাব পাননি।
খোকন বলেন, “আমি কিছু বললাম না (ত্ব-হার বক্তব্য শোনার পর)। তখন আমি ওনার বাসায় (শ্বশুর বাড়ি) গেলাম। যাওয়ার পরে ওনার শালি বলল, ‘এখন কোনো কথা বলবে না। কালকে ব্রিফিং হবে তখন তিনি কথা বলবে’।”
‘এই পর্যন্তই আমি ছিলাম। পরে আমি চলে আসলাম’- বলেন খোকন।
উল্লেখ্য, গত ১০ জুন দিবাগত রাত থেকে কোনো খোঁজ মিলছিল না আবু ত্বহা, তার দুই সঙ্গী আব্দুল মুহিত, মোহাম্মদ ফিরোজ ও গাড়িচালক আমির উদ্দিনের।
সেদিন বিকেল ৪টার দিকে ওই তিনজনসহ আবু ত্ব-হা রংপুর থেকে ভাড়া করা একটি গাড়িতে ঢাকার পথে রওনা দেন। রাতে মোবাইল ফোনে সর্বশেষ কথা হলে তিনি সাভারে যাচ্ছেন বলে তার মাকে জানান।
এরপর রাত ২টা ৩৬ মিনিটে স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় আদনানের। তিনি সাভার যাচ্ছেন বলেই জানান স্ত্রীকেও। তারপর থেকেই তার ফোন বন্ধ থাকায় আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি শেষে তাকে না পেয়ে ১১ জুন বিকেলে রংপুর কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন ত্ব-হার মা আজেদা বেগম।
