‘অভাবের তাড়নায় স্কুল বিমুখ হয়ে শুঁটকি পল্লীতে কঠোর পরিশ্রম করে শিশুরা’

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের শুটকি পল্লীতে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা।

 

তারা বলেন, শত শত শিশু অভাবের তাড়নায় স্কুল বিমুখ হয়ে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে কঠোর পরিশ্রম করে থাকে। এরা সমাজের বোঝা হয়ে দাড়াবে। সুযোগ পেলে এই শিশুরা একদিন পড়ালেখা করে সম্পদে পরিনত হবে।

 

এছাড়াও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতকে তালিকাভুক্ত করে শিশুশ্রম বন্ধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারকে কাজ শুরু করার সুপারিশ করেছেন বক্তারা।

 

তারা মনে করছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থবরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে সঠিকভাবে সচেতনতা গড়ে তোলা না গেলে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।

 

সোমবার (২২ মার্চ) দুপুরে উইনরক ইন্টারন্যাশনাল নামের বেসরকারি সংগঠনের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রকল্পের আওতায় শহরের কলাতলীর ইউনি রিসোর্ট হোটেলের হলরুমে ইপশার বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি এবং শুঁটকি পল্লীর মালিক ও সমিতির সদস্যদের নিয়ে শুঁটকি পল্লী থেকে শিশুশ্রম নিরসনে সচেতনতা বৃদ্ধিতে করনীয় এক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

 

কর্মশালায় বলা হয়, শহরের নাজিরারটেকের বিশ্বের বৃহত্তম শুঁটকি পল্লীতে কর্মরত তিন সহস্রাধিক শিশু মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের পেশায় শুঁটকি পল্লীতে কাজ করা শিশু শ্রমকে নথিভুক্ত করা হয়নি। শুঁটকি সেক্টরে কর্মরত এসব শিশু দারিদ্র্যের কারণে পড়ালেখা বাদ দিয়ে এখানে শ্রম বিক্রি করে। এতে শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতেও পতিত হচ্ছে তারা, যা শিশু অধিকার লঙ্ঘন। এসব কারণে শিশু অধিকার বিষয়ে যেসব আন্তর্জাতিক আইনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে সেসব আইন বাস্তবায়নের দাবি জানান।

 

শুরুতে ইপসার ক্লাইম্ব প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী বিশ্বজিৎ ভৌমিক এবং মেজবাহ উদ্দিন মাসুমের যৌথ সঞ্চালনায় শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে শিশুশ্রম বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

 

গবেষণা প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, যেসব শুঁটকি পল্লিতে এই গবেষণা চালানো হয় সেসব শুঁটকি পল্লীতে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে ২০ শতাংশই শিশু। তাদের মধ্যে আবার ৭২ শতাংশ মেয়ে ও ২৮ শতাংশ ছেলে। এসব শ্রমিকের মধ্যে ৪১ শতাংশের বয়স ১৪ বছরের নিচে। ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে রয়েছে ৫৯ শতাংশ। এছাড়াও ৫৬১টি শুঁটকিমহালের মধ্যে ২৩ শতাংশ বড়, ৫৩ শতাংশ মাঝারি এবং ২৪ শতাংশ ছোট আকারের। গবেষণায় বেরিয়ে আসে, শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৯২ শতাংশ বাংলাদেশি ও আট শতাংশ রোহিঙ্গা। তা ছাড়া ৭৫ শতাংশ শিশু শ্রমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

 

কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো: হাসানুজ্জামান। তিনি শিশুশ্রম বন্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন, শুঁটকি খাত কক্সবাজারের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। সম্ভাবনার এই খাতকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য যে যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করা দরকার এবং এ শিল্প থেকে শিশুশ্রম নিরসনে সবাইকে এগিয়ে এসে সহায়তা করতে হবে।

 

তিনি আরোও বলেন, শুঁটকি পল্লীতে শিশুশ্রম নিরসের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। তা না করতে পারলে শিশুশ্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা কঠিন হবে বলেও তিনি দাবি করেন।

 

পুলিশ সুপার বলেন, শুঁটকি পল্লীতে শিশুরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে বলে শুনেছি। তবে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা কাজ করছি। সে জন্য সরকারি-বেসরকারি অনেক সংস্থা প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে।

 

এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুনির উল গীয়াস। কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ক্লাইম্ব প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম জামান খান। বক্তব্য রাখেন, পৌরসভার ২ নাম্বার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আক্তার কামাল, ১২৩ সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিল শাহেনা আক্তার পাখি। এডভোকেট সাকী এ কাউছার (সাকী), নাজিরারটেক ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আতিকুল্লাহ কোম্পানি।

 

এসময় উপস্থিত ছিলেন, ইউনরক ইন্টারন্যাশনালের প্রোগ্রাম অফিসার আসমা আক্তার, বাংলাদেশ মহিলা নারী আইনজীবী সমিতির প্রজেক্ট কো-অডিনেটর সায়েদা নুর নাবিলা তাবাচ্ছুম, স্বপ্নজালের প্রধান নির্বাহী শাকির আলম প্রমুখ। কর্মশালায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *