১০ বছরেও আসামী গ্রেফতার না করায় ওসিকে আদালতে তলব

সাইফুল ইসলাম মুকুল, রংপুর ব্যুরো: দীর্ঘ ১০ বছর ধরে দু’টি পারিবারিক আদালতে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল না করে আদালতের আদেশকে অবজ্ঞা করায় অবশেষে বদরগঞ্জ থানার ওসি হাবিবুর রহমানকে স্বশরীরে আদালতে হাজির হবার আদেশ দিয়েছেন আদালত। সেই সঙ্গে থানায় থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির রেজিস্টারও তলব করা হয়েছে।

 

আদালতের আদেশ পালন না করায় কেন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না তারও ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

 

রংপুরের বদরগঞ্জ থানা পারিবারিক আদালতের বিচারক মতিউর রহমান এ আদেশ প্রদান করেছেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী ফারুখ সরকার এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রংপুরের বদরগজ্ঞ উপজেলার কুতুবপুর অরুন নেছা গ্রামের মোজাফফর শাহের মেয়ে মোছা. হাসনা বানু ২০১২ সালের ২৬ ফেরুয়ারি তারিখে একই উপজেলার কাঁচাবাড়ি গ্রামের তার স্বামী তাজনার সরকারের বিরুদ্ধে তাকে খোরপোষ প্রদান না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। (যার মামলা নম্বর ১১/১২ইং)।

 

একইভাবে বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর গ্রামের মোজাম উদ্দিনের মেয়ে মনশেফা বেগম বাদী হয়ে একই গ্রামের তার স্বামী ওয়াজেদ আলীর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে গত ২০১২ সালের মার্চ মাসে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর ১৩/১২ইং। দু’টি মামলাতেই আসামিদের দীর্ঘ ১০ বছরেও আদালতে হাজির হয়নি। বিজ্ঞ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিলেও বদরগজ্ঞ থানা পুলিশ সেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল ও আসামিদের গ্রেপ্তার করেনি।

 

আদালত সূত্রে জানা যায়, আদালতে সেরেস্তা পরিদর্শন করতে গিয়ে বিচারক পারিবারিক জারি মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখেন যে, একাধিক পারিবারিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু উপরোক্ত দুই মামলায় বদরগঞ্জ থানা আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করেনি এবং কেন তামিল করা সম্ভব হয়নি সে বিষয়ে কোন প্রতিবেদনও আদালতে প্রেরণ করা হয়নি।

 

এর প্রেক্ষিতে গত ১৭-১০-২১ইং তারিখে উক্ত জারি মোকদ্দমাগুলো আদেশের জন্য নেয়া হয় এবং থানায় তাগিদ পত্র ইস্যু করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয় এবং ব্যর্থতায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে মর্মে সতর্ক করা হয়। এভাবে তাগিদ পত্র ইস্যু করে সতর্ক করা হলেও একাধিক মামলায় থানা হতে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিবেদন ধার্য তারিখের মধ্যে দাখিল না করার কারণে থানার ওসির নিকট হতে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল।

 

আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারি ডিং- ১১/১২, পারি ডিং-১৩/১৯, পারি ডিং ৭/১৩ পারি ডিং ১১/১৭ মামলাগুলোতে একটি একই রকম ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, থানায় রক্ষিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানার রেজিস্ট্রার পর্যালোচনায় অত্র মোকদ্দমার আসামিদের বিরুদ্ধে উক্ত থানায় মুলতবী কোন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাওয়া যায়নি এবং তার সময়কালে অত্র মোকদ্দমার কোন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পাওয়া যায়নি।

 

একই রকম ব্যাখ্যা সব মোকদ্দমায় দেয়ার প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বদরগঞ্জ থানার ওসির পাঠানো প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাকে আগামী ২২ নভেম্বর থানায় রক্ষিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানার রেজিস্ট্রারসহ আদালতে স্বশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের আদেশ দিয়েছেন।

 

বিজ্ঞ বিচারক আদেশ নামায় দেয়া পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ১৯৪৩ সনের পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল অনুসারে যে তারিখের মধ্যে গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য দিন ধার্য থাকে উক্ত ধার্য তারিখের মধ্যে যদি ওয়ারেন্ট তামিল করা সম্ভব না হয় তাহলে অফিসার ইন চার্জ ধার্য তারিখের সকালের মধ্যে ওয়ারেন্ট তামিল করতে না পারার কারণ উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বাধ্য।

 

আবার, ক্রিমিনাল রুলস এন্ড অর্ডারস অনুসারে আদালতের কোন পরোয়ানা জারী করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলে পুলিশ আদালত কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জারী করতে বাধ্য এবং কোন যৌক্তিক কারণে জারী করতে ব্যর্থ হলে আদালতের নির্ধারিত তারিখের পূর্বেই কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিতে হবে।

 

আদালতের আদেশে আরও বলা হয়, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন অনুযায়ী আদালতের আদেশ প্রতিপালন করা প্রত্যেক পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব এবং উক্ত দায়িত্ব অবহেলা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

 

এ ব্যাপারে বদরগঞ্জ পারিবারিক আদালতের বেঞ্চ সহকারী ফারুখ সরকার জানান, আলোচিত দুই মামলা ছাড়াও আরও ১৪টি পারিবারিক আদালতের মামলায় আদালতের দেয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বদরগঞ্জ থানা তামিল করছে না আসামিদের গ্রেপ্তার করছে না।

 

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আদালতের যে কোন আদেশ থানার ওসিদের পালন করা নৈতিক দায়িত্ব আইনগতভাবেও তিনি বাধ্য। কিন্তু আদালতের আদেশকে অবজ্ঞা করা আদালত অবমাননার সামিল। এ জন্য আদালত ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিতে পারেন।

 

অন্যদিকে রংপুর আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী আরিফ ইসলাম বলেন, আদালতের আদেশ প্রতিপালন করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। তদুপরি দীর্ঘ ১০ বছরেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল না হওয়া দুঃখজনক। এটা বিলম্বিত বিচার না পাওয়ার শামিল বলে তিনি মনে করেন।

 

এ বিষয়ে বদরগঞ্জ থানার ওসি হাবিবুর রহমানের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *