রাকিবুল ইসলাম রাফি, রাজবাড়ী প্রতিনিধি: জীর্ণপ্রায় এক ইটের স্তুপ, শেওলা আর আগাছা বেষ্টিত দেয়াল, টোকা দিলেই যেন হুড়মুড়িয়ে যাবে শতবর্ষ পুরনো দালানের অস্তিত্ত্ব। বের হয়ে থাকা লাল ইটের দেয়াল আর পোড়ামাটির টেরাকোটা যেন জানান দিচ্ছে এক মহাকালের ইতিহাস। একসময় কাসার ঝংকারে, ঢাক-ঢোল, বাদ্য আর বাজনায় মুখরিত থাকত যে অঞ্চল সেখানে আজ শ্মশানের নীরবতা।
নেই সন্ধ্যা আরতি দেয়ার পুরোহিত, নেই পুজারীর মুখর পদচারণা আর ঘন্টার টুংটাং শব্দ। যেখানে সন্ধ্যা হলেই শঙ্খের সুর ভেসে যেত দূর থেকে দূরান্তে, সেখানে আজ মন খারাপ করে দেয়া নীরবতা। কালের স্মৃতি বুকে ধারণ করে শুধু মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে দোচালা এক উপাসনালয়।
রাজবাড়ীর একটি প্রাচীন মন্দিরের কথা বলছিলাম। পদ্মাপাড়ের পদ্মা কন্যা খ্যাত জেলা রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের নলিয়া গ্রামে অবস্থান এই মন্দিরের। মন্দির এখানে একটা নয়, বরং দুটি। স্থানীয়দের মতে বর্তমান মন্দিরের অবস্থান যে স্থানে সেখানে আগে ছিলো পদ্মার চর এবং সে স্থানটি ছিলো নলখাগড়ার বনে পরিপূর্ণ, যে কারণে মানুষের মুখে মুখে এই স্থানের নাম হয়ে যায় নলিয়া।
আনুমানিক ১৬৫৫ খৃষ্টাব্দে রাজা সীতারাম রায় এই মন্দির স্থাপন করেন এবং বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই আমলে এই গ্রামে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের সন্ধান না মেলায় রাজার অনুরোধে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে শ্রী কৃষ্ণ রাম চক্রবর্তী এই নলিয়া গ্রামে এসে দেব মন্দির এবং বিগ্রহ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মন্দিরটি নির্মাণে উড়িষ্যার গৌরীয় স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বহু স্থানে এই ধরণের স্থাপত্যরীতির মন্দির দেখা যায়। এই নির্মাণরীতির মধ্যে আবার দুটি ধারা রয়েছে। একটি ‘চালা’ ধারার এবং অপরটি ‘বাংলা’ ধারার। নলিয়ার এই মন্দিরটি ‘বাংলা’ ধারায় নির্মিত। দুটো চূড়া বিশিষ্ট বলে ‘জোড় বাংলা’ নাম হয়েছে এই মন্দিরের।
সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে একটি মন্দিরের চূড়াই অবশিষ্ট রয়েছে, আরেকটি হার মেনেছে সময়ের কাছে। মন্দিরের দেয়ালে এখনও দেখা যায় মধ্যযুগীয় টেরাকোটা শিল্পের অপূর্ব কিছু নিদর্শন। পোড়ামাটির ফলকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন শ্লোক, স্তুতি আর হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন কাহিনী। মন্দিরের বিগ্রহ অনেক আগেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। অযত্ন আর অবহেলায় সংস্কারের অভাবে গাছ আর লতাপাতার স্তূপে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন কোন সংস্কার না হওয়ায় মন্দিরটি তার তিনশো বছরের ঐতিহ্য হারাচ্ছে। পুরানো জৌলুস হারিয়ে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া এই মন্দির দেখতে তারপরও প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন অনেক দর্শনার্থী। মন্দিরটি দ্রুত সংস্কার করে শত বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার দাবি জানিয়েছেন আগত দর্শনার্থীরা।
মন্দিরের সেবায়েত বিদ্যুৎ কুমার মুখার্জি বলেন, রাজা সীতারাম রায়ের আমলে এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়। এখানে মন্দিরের নামে এখনো ৩১ শতাংশ জমি রয়েছে। এর বেশির ভাগ জমিই এখন বেদখল হয়ে গেছে। এই মন্দিরগুলোর বর্তমান অবস্থা খুবই শোচনীয়। দ্রুত সংস্কার করা না হলে মন্দিরগুলোর অস্তিত্ব আর থাকবে না।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আম্বিয়া সুলতানা বলেন, ইতিমধ্যে আমার এই জোড় বাংলা মন্দির সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর কে জানিয়েছি। তারা উক্ত স্থান দেখে ছবি সহ প্রয়োজনীয় তথ্যাদি নিয়ে গেছে। আশা করছি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
