মৃৎশিল্পীদের জীবনটাই কারুকার্যময়

রাকিবুল ইসলাম রাফি, রাজবাড়ী প্রতিনিধি: মৃৎশিল্পীদের জীবনটাই কারুকার্যময়, এ কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও কাজ করেন। নারী মৃৎশিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় সুন্দর সুন্দর মাটির জিনিসপত্র।

 

মাটির ফল-ফলাদিসহ হাঁড়ি-পাতিল, শিশুদের খেলনা, দৃষ্টিনন্দন ফুলদানি, পশু-পাখি, পুতুল, মাটির ব্যাংক, কলসসহ আরও অনেক কিছু। এগুলো মেলা, হাট-বাজার, ভ্যান বা মাথায় করে বিক্রি করেই চলত পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের সংসার।

 

মাটির হাঁড়িপাতিল তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করা রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মাছপাড়া, কলিমহর ও কসবামাজাইল এলাকার পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা ভালো নেই। কষ্টে কাটছে তাদের দিন। হতাশার ছাপ তাদের চোখে-মুখে। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন তারা। এক সময় মাটির তৈরি তৈজসপত্র ছিল মানুষের চাহিদা পূরণের একমাত্র ভরসা। গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া আর অতিথি আপ্যায়ন, প্রায় সব কাজেই মাটির তৈরি হাঁড়ি পাতিল, তৈজসপত্রের ব্যবহার ছিল। স্বাস্থ্যকর আর সহজলভ্য বলে সব পরিবারেই ছিল মাটির পাত্রের ব্যবহার।

 

এ প্রসঙ্গে কলিমহর মুরাদপুর পালপাড়ার স্বপ্না রানী পাল বলেন, ‘মাটির তৈজসপত্র তৈরি করতে এঁটেল মাটি লাগে। এঁটেল মাটি আগে বাড়ির কাছেই পাওয়া যেত। এখন আর তা সহজে পাওয়া যায় না। অনেক দূর থেকে গাড়ি করে আনতে হয়। এক গাড়ি মাটি কিনতে লাগে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। তারপরও মাটির মান ভালো থাকে না। এর মধ্যে থাকে বালুমাটি, যে কারণে ঠিকমতো কাজ করা যায় না। আসবাবপত্র বানাতে গেলে ফেটে যায়। এবার আমি কিস্তি থেকে টাকা নিয়ে মাটি কেনার টাকা জোগাড় করেছি। এত টাকা দিয়ে মাটি কিনে জিনিসপত্র তৈরি করেও সঠিক মূল্য পাই না। পরিবার নিয়ে চলতে অনেক কষ্ট হয়।’

 

বাড়ির পাশে বসে মাটির বড় হাড়ি তৈরি করছিলেন কসবা মাজাইল সুবর্ণখোলা পালপাড়ার সুভাষ পাল। সারা দিন কাজ করেও এ পেশায় ঠিকমতো সংসার চলে না তার। খেয়ে না খেয়েই কাটে তার সংসার। এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় যাওয়ার পুঁজি নেই বলে পেশা পরিবর্তন করতে পারছেন না তিনি। বিভিন্ন ভাবে ঋণের চেষ্টা করেও পাননি ঋণ সহায়তা। এমনটাই বলছিলেন তিনি।

 

সারাদেশে করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে প্রণোদনা পেয়েছে অনেকেই। একমাত্র মৃৎ শিল্পের সাথে যারা জড়িত রয়েছে তাদের ভাগ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। আগে হাঁড়ি, পেলেট, চারি, টব, কাসা, পুতুলসহ সব ধরনের মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার ছিল ব্যাপক ভাবে সেকারণে একটু ভালো দাম পাওয়া গেলেও এখন দাম অনেক কমে গেছে। প্ল্যাস্টিক, স্টিল, মেলামাইন, সিরামিকের জিনিসের কদর বাড়ায় এর ব্যবহারও হ্রাস পেয়েছে।

 

কুমোরদের অভিযোগ, মৃৎশিল্পের সাথে জড়িতরা কোনোদিনই সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ পায় না। কুমোরদের জন্যও সরকারের ঋণের ব্যবস্থা করা উচিত। কৃষিখাতের মতই প্রণোদনা ও ৪% সুদে ঋণের দাবি করেন তারা।

 

প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই কুমোর বা মৃৎশিল্পীরা এখনো বেঁচে আছেন শীতে রসের হাড়ি, পূজা আর বাংলা নববর্ষকে ঘিরে।

 

পাংশা উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরিদ হাসান ওদুদ বলেন, ‘কুমোররা সত্যিই খুব কষ্টে, মানবেতর দিনাতিপাত করছে। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় তারা আরও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সরকারের প্রতি আবেদন, ঋণ বা যে কোনো ধরনের সহায়তার মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ান।’

 

সরকারিভাবে এসব কুমারদের যথোপযুক্ত সাহায্য দেওয়া হলে এই শিল্প বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তা না হলে এই শিল্প একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *