এমন সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন: সেনাবাহিনী প্রধান

নজর২৪ ডেস্ক- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবনিযুক্ত সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। তিনি পূর্বতন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের নিকট থেকে বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

 

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর নবনিযুক্ত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ শিখা অনির্বাণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শাহাদতবরণকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর সেনাকুঞ্জে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে এবং সেখানে তিনি একটি গাছের চারা রোপণ করেন।

 

এর আগে সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম শাহীন ইকবাল এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান নবনিযুক্ত সেনাবাহিনী প্রধানকে জেনারেল র‌্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দেন।

 

র‌্যাংক ব্যাজ পরানোর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবনিযুক্ত সেনাপ্রধানকে অভিনন্দন জানান এবং তার সফলতা কামনা করেন। এ সময় নতুন সেনাপ্রধানও প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং তার জন্য দোয়া কামনা করেন।

 

র‌্যাংক ব্যাজ পরানোর অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমেদ চৌধুরী।

 

সেনাবাহিনীকে অভীষ্ট লক্ষ্যে নিতে সহযোগিতা কামনা: দায়িত্বভার গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সকলের দোয়া এবং সহযোগিতা চেয়েছেন নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ।

 

তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি যে, সকলের সহযোগিতায় আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আমার ওপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। আমি বাংলাদেশের উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করছি। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

 

নতুন সেনাপ্রধান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিব জন্মশতবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি পেশাদার, সুদক্ষ ও গৌরবমণ্ডিত বাহিনীর নেতৃত্ব (১৭তম সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে) দেয়ার সৌভাগ্য লাভের জন্য আমি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। আমি বিশ্বাস করি- এটি একটি স্বর্গীয় আশীর্বাদ এবং এমন সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন। আমি প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমার ওপর আস্থা রেখে এই গুরুদায়িত্ব আমাকে অর্পণের জন্য।

 

জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নেতা এবং আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে- যার একক নেতৃত্বে সূচিত হয়েছিল মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং আমরা পেয়েছি আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

 

তিনি বলেন, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই শহীদদের যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ একটি স্বাধীন দেশে গর্বের সঙ্গে বাস করতে পারছি। একই সঙ্গে আমি বিশেষভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সেই সকল বীর শহীদদের যারা জাতি ও মানবতার কল্যাণে দেশে ও বিদেশে নিজ জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমি সকল শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

 

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে জনগণের দূরত্ব থাকবে না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিডিয়ার দূরত্ব থাকবে না।

 

সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ সেনাসদরে কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং দুই কন্যা সন্তানের বাবা।

 

জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ ১ ডিসেম্বর ১৯৬৩ সালে খুলনা জেলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন আহমেদ স্বাধীনতা-পূর্বকালে একনাগাড়ে দুই যুগ জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ ১৯৮৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ৯ম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সঙ্গে কমিশন লাভ করেন। কমিশন পরবর্তী তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন এলাকায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে তার সামরিক কর্মজীবন শুরু করেন।

 

তিনি ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ইন ডিফেন্স স্টাডিজ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি) থেকে ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এ প্রথম বিভাগ নিয়ে এমফিল শেষ করেন। বর্তমানে তিনি বিইউপির অধীনে পিএইচডি করছেন। জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ প্রথম স্থান অধিকার এবং এমআইএসটি গোল্ড মেডেল অর্জনসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

 

তিনি ২০১০ সালে সফলতার সঙ্গে চীনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি (এনডিইউ) থেকে ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ কোর্স এবং মিরপুরে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ থেকে আর্মি স্টাফ কোর্স শেষ করেন। পাশাপাশি তিনি এনডিইউ, ওয়াশিংটন থেকেও গ্র্যাজুয়েশন করেন। বর্ণাঢ্য চাকরি জীবনে তিনি জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) হিসেবে আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একমাত্র লজিস্টিকস্ ফরমেশন এবং ১৯ পদাতিক ডিভিশন কমান্ড করেন।

 

এছাড়া তিনি একটি পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে কাউন্টার ইমারজেন্সি অপারেশন এলাকায় একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে কমান্ড নিযুক্তিতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (বিআইআইএস) মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

 

জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন পাইওনিয়ার ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার হিসেবে ২০১৪-১৬ পর্যন্ত ইউনাইটেড ন্যাশনস্ মাল্টিডাইমেনশনাল ইন্টিগ্রেটেড স্ট্যাবিলাইজেশন মিশন ইন দ্যা সেন্ট্রাল আফ্রিকাতে (মিনুস্কা) বহুজাতিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং অসামান্য কর্মদক্ষতার জন্য এসআরএসজি থেকে সাইটেশন প্রাপ্ত হন।

 

তিনি বিভিন্ন ফরমেশন সদর দফতরে সিনিয়র অপারেশনাল এবং প্রশাসনিক স্টাফ অফিসারসহ সিনিয়র ডাইরেক্টিং স্টাফ হিসেবে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, প্রশিক্ষক হিসেবে ক্যাডেট কলেজ এবং প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সদর দফতর আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের (আর্টডক) চিফ অব ডকট্রিন ডিভিশন এবং সেনাবাহিনী সদর দফতরে সামরিক প্রশিক্ষণ পরিদফতরের পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *