ভূমিদস্যু পরিবারের প্রতারণায় আতঙ্কে অসহায় মানুষ

নাজমুস সাকিব মুন, পঞ্চগড় প্রতিনিধি: ত্রিশ বছর ধরে নিজের কেনা জমিতে বাড়ি করে আছেন সাত্তার। হঠাৎ করে দুই বছর আগে শুনেছেন সেই জমি তার নয়। এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য বেলাল বসুনিয়া তার বসত ভিটা দাবি করে বসেন।

 

পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নে এমনই এক পরিবারের সন্ধান মিলেছে। পরিবারটির প্রধান বেলাল বসুনিয়া ওরফে বেলাল মেম্বার আশির দশকে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জমি কেনার শুরুটা তখনই।

 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ প্রতারণার মাধ্যমে অক্ষরজ্ঞান না জানা ব্যক্তিদের নিকট থেকে একের পর এক জমি কিনেছেন বেলাল বসুনিয়া। কখনো পরিমাণে কম জমির কথা বলে বেশি, কখনো বা মিথ্যা দাতা সাজিয়ে জমি ক্রয়, কখনবো অন্য জমি দেখিয়ে ভিটেমাটি লিখে নেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে ভুক্তভোগীদের সাথে।

 

ভুক্তভোগীরা জানতেনও না তাদের সাথে প্রতারণা করে সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার ছক কষছেন বেলাল বসুনিয়া। শুধু সাত্তার নন বেলালের নীল নকশা থেকে রেহাই পান নি মতিয়ার, সুবাস, সাত্তার, রুবেল, সেবেন্দ্রনাথ সহ আরো অনেকে।

 

ওই এলাকার বাসিন্দা জগ্ননাথ জানান, তার কাকা সুবাস বেলাল মেম্বারের কাছে ৬ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। কিন্তু সুবাসের মৃত্যুর পর বেলাল ৬৬ শতাংশ জমি দাবি করেন এবং তার স্বপক্ষে দলিল উপস্থাপন করেন। শুধু তাই নয় জগন্নাথের জমি না থাকার পরও তার নিকট থেকে টাকার বিনিময়ে জমির ভুয়া দলিল করে নেয়ার প্রস্তাব দেন বেলালের ছেলেরা।

 

তেরপুপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাত্তারের স্ত্রী জানান, এরশাদ সরকারের আমলে তার বাবা ৩৩ শতাংশ জমি কিনে বসতভিটা স্থাপন করেন। তার বাবা বেঁচে থাকা অবস্থায় জমি দাবি না করলেও মৃত্যুর পর বেলাল মেম্বারের ছেলেরা ১২ শতাং জমি দাবি করে বের করে নেন।

 

তেরপুপাড়া এলাকায় ১৯৮৪ সালের দিকে তেরপুপাড়া আদর্শ যুব সংগঠন নামে একটি ক্লাব ছিল। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য নূরইসলাম বলেন, আমাদের ক্লাবের নামে প্রায় ২৮ শতক জমি ছিল। সেই জমিও বেলাল মেম্বার ও তার ছেলেরা দাবি করে বসেন।

 

প্রতিষ্ঠার দুই বছর পরই ক্লাবের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। যদিও বিএনপি সরকারের আমলে রাব্বি বসুনিয়া ক্লাবের নামে বেশ কয়েকবার সরকারি বরাদ্দ এনে আত্মসাৎ করেছেন। ক্লাব স্থাপনের পর পাশে দূর্গা পূজার আয়োজন করা হতো। তিন বছর দূর্গাপূজা আয়োজনের পর একরাতে প্রতিমা ও মন্দিরে ভাঙ্গচুর চালানো হয়। তখন থেকে আর পূজা অনুষ্ঠিত হয়নি।

 

চিলাহাটি ইউনিয়নের বাবুপাড়া এলাকার অখিল অভিযোগ করেন, বাবুপাড়ার প্রায় ৪০ বছরের পুরনো কালী মন্দিরের নামে ১২ শতক জমি ছিল প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে। সেখানেও বেলালের ছেলেরা ৬ শতক জমি দাবি করে বের করে নেন।

 

ভুক্তোভোগীরা অভিযোগ করেন তাদের বাপ-দাদারা জমি বিক্রি করলেও তারা জানেন না। তারা বেঁচে থাকা অবস্থায় জমি দখলে আসেনি কেউ। কিন্তু তারা মারা যাওয়ার পর তাদের ছেলেদের কাছে জমি দাবি করে বসেন বেলাল বসুনিয়া ও তার ছেলেরা। এভাবে সুকৌশলে একের পর এক জমি হাতিয়ে নেয়ার পায়তারায় লিপ্ত পরিবারটি।

 

এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় পরিবারটির প্রতারণা আর মিথ্যা অভিযোগে নির্যাতনের শিকার হয়ে জোট সরকারের আমলে হিন্দু পরিবারের অন্তত তিনজন ব্যক্তি স্বপরিবারে ভারতে পাড়ি দেন। পরিবারটির বড় ছেলে রাব্বি বসুনিয়া ইউনিয়ন বিএনপি’র সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

 

ওই এলাকার আলাউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন নিজের কেনা ১০ বিঘা জমি যখন বুঝে নিতে যাই তখন প্রায় সব জমি বেলাল মেম্বারের ছেলেরা দাবি করে বসেন। আমার ন্যায্য জমি আমি এখনো পাইনি।

 

সর্বশেষ ১৫ এপ্রিল এলাকার একটি বিচারাধীন জমিতে ঘর তুলতে বাধা দেয়ায় পরিবারটির ধারালো অস্ত্রের আক্রমণের শিকার হয় বাসুদেব। এতে তার কপালে, বাম চোখে ও নাকের উপরিভাগে গভীর ক্ষত হয়। এখনো তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

 

সেদিনের সেই ঘটনার শেষ ভাগ সুকৌশলে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেন বেলালের ছেলেরা, যখন বাসুদেবের পরিবার আত্মরক্ষার্থে লাঠি, শাবল নিয়ে আসেন শুধু সেই সময়ের ভিডিও ধারণ করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায় ঘর তুলতে মৌখিক বাধা দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে বেলালের চার ছেলে প্রথমে আক্রমণ চালায়।

 

তবে এই বিষয়ে বেলাল বা তার ছেলেদের কারো সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। বেলালের বাসায় এই বিষয়ে কথা বলতে গেলে তার পুত্রবধু লিজা প্রতিবেদকের ভিডিও ধারণ করতে থাকেন। এমনকি বেলালের ফোন নাম্বার চাইলেও তা দিতে রাজি হননি পরিবারের কেউ।

 

তবে বেলাল মেম্বারের ছোট ভাই ফেরদৌস বসুনিয়া অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করেন। তিনি বলেন, অভিযোগকারীরা জমি বিক্রি করে পুনরায় জমি দাবি করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *