দেশে আবারো বিদ্যুতের লোডশেডিং শুরু হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকরা দুর্ভোগে পড়েছেন। লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
বিশ্ববাজারে দাম চড়া। তাই খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে না সরকার। দেশে কমে গেছে গ্যাসের সরবরাহ। রান্নার চুলা থেকে শিল্পের চাকাও ভুগছে গ্যাস সংকটে। আর গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বেড়েছে লোডশেডিং। জ্বালানি স্বল্পতার কারণে সন্ধ্যায় ১২০০ থেকে ১৩০০ মেগাওয়াট ঘাটতি হচ্ছে। ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে গড়ে উৎপাদন ১২ হাজার ৮১৮ মেগাওয়াট।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, একশ’ কোটি ঘনফুট এলএনজি আনার কথা থাকলেও আসছে ৫০ কোটিরও কম। অন্যদিকে দাম বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি না কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।
বিদ্যুতে হঠাৎ করে লোডশেডিংয়ের কারণ কী জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমরা গত দুইদিন ধরে লোডশেডিং করছি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের পরিস্থিতি দেখেছেন। অস্ট্রেলিয়াও গত দুই সপ্তাহ ধরে রেশনিং করছে।
মহাপরিচালক আরও জানান, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের একটা সংকট। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ চেইনে দেখা দিয়েছে সমস্যা। আমাদের নিজস্ব জ্বালানি নেই। জ্বালানি আমদানি করতে হয়। ভবিষ্যতে হয়তো আরও চ্যালেঞ্জ হবে। আরও কিছু সিদ্ধান্ত হয়তো নিতে হতে পারে। এজন্য দোকানপাট ৮টার পর বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈদের পর থেকে তা পুরোপুরি কার্যকর হবে।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাহত হচ্ছে। সামনে হয়তো আরও হবে।
প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, আমাদের ১৩শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের দাহিদা রয়েছে। অন্যান্য সময়ে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলএনজি আমদানি কমায় গ্যাস সরবরাহ গত কয়েকদিনে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। জ্বালানি তেলের দামও চড়া। দিনে ১০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান করছে বিপিসি। তাই তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রও পুরোদমে চালানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
এদিকে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটায় সারা দেশেই কম বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে এটি ফোর্স লোডশেডিং। অর্থাৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বাড়ালে লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন পড়তো না। তারপরও করা হচ্ছে। খোদ রাজধানীতে এতদিন যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল, সেখান থেকেও সরে আসা হয়েছে।
ইস্কাটনের বাসিন্দা নেহা সুলতানা জানান, দীর্ঘদিন লোডশেডিং ছিল না। হুট করে এমন ঘটনায় আমরা বিভ্রান্ত। শুক্রবার থেকেই দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার আধঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন জানান, বাসায় দুজন রোগী। এসি কিনেছিলাম। এখন তো ফ্যানই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। নতুন করে ভোগান্তিতে পড়লাম।
মিরপুরের এক বাসিন্দা জানান, আজ সারা দিন বারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এমনিতে গরম। শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্ট বাড়বে।
ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানি জানিয়েছে, সব মিলিয়ে তাদের ৩০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ ঘাটতি হচ্ছে। ঘাটতি মেটাতে এলাকা ভেদে ৩০ মিনিট করে লোডশেডিং করা হচ্ছে।
ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিপিডিসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, সকালে ১৪০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পেয়েছি। সন্ধ্যায় তা কমে ১২০০/১২৫০ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে আমাদের ১২০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ঢাকা পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাওসার আমির আলী বলেন, আমাদের ঘাটতির পরিমাণ ১৫০ থেকে ১৭৫ মেগাওয়াটের মতো। চাহিদা থাকে ১০০০ মেগাওয়াট। সকালে পেয়েছি ৮৫০ মেগাওয়াট। এখন চাহিদা কিছুটা বেশি হওয়ায় লোডশেডিং বাড়বে। বিভিন্ন এলাকায় আধঘণ্টা লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে লোডশেডিংয়ের অবস্থা তুলনামূলক বেশি খারাপ। অনেক অঞ্চলে ৪-৫ ঘণ্টা করেও বিদ্যুৎ থাকছে না।
