১০ কিলোমিটার নৌকা ভাড়া ‘৫০ হাজার’ টাকা!

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সালুটিকর থেকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার তেলিখালের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। এই ১০ কিলোমিটার দূরত্বে যাওয়ার জন্য নৌকা ভাড়া ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। খবর- নিউজবাংলার।

তেলিখালের গ্রামের বাড়িতে পানিবন্দি অবস্থায় থাকা অসুস্থ স্ত্রীকে আনতে সালুটিকরে নৌকা ভাড়া করতে আসেন মারুফ আহমদ। সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে একমাত্র ভরসা নৌকা, কিন্তু এই নৌকাই এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে।

মারুফ বলেন, ‘চাকরির জন্য আমি সিলেট শহরে থাকি। বাড়িতে আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী পানিবন্দি হয়ে আছেন। তাকে আনার জন্য একটি নৌকা ভাড়া করতে এসেছিলাম, কিন্তু ৫০ হাজার টাকার নিচে কোনো নৌকা যেতে চাচ্ছে না। আমি ৪০ হাজার পর্যন্ত বলেছি। কেউ যায়নি।’

সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার পর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নৌকায় যাত্রী বহন করছে সালুটিকর থেকে। বালুবাহী বড় ইঞ্জিন নৌকা দিয়ে যাত্রী বহন করা হচ্ছে এই এলাকা থেকে, তবে কোম্পানীগঞ্জ যেতে একেকজন যাত্রীর কাছে দাবি করা হচ্ছে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। টাকা দিয়েও অনেক সময় নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক জফির সেতুর বাড়ি কোম্পানীগঞ্জে।

তিনি বলেন, ‘শুক্রবার পানিবন্দি একটি পরিবারকে উদ্ধারের জন্য একটি নৌকাকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলেছি, কিন্তু মাঝি রাজি হয়নি।’

ভাড়া এমন বাড়িয়ে দেয়া প্রসঙ্গে ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকার চালক তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘আমরা মালিকের নির্দেশমতো কাজ করছি। মালিক এমন ভাড়া নিতে বলেছেন।’

কেবল এই এলাকাই নয়, বন্যাদুর্গত পুরো সিলেটেই নৌকার জন্য হাহাকার দেখা গেছে। নৌকার অভাবে পানিবন্দি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রেও আসতে পারছেন না; জলমগ্ন ঘরেই আটকে আছেন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের বাসিন্দা নিহাল আহমদ বলেন, ‘আমার পুরো পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে, কিন্তু তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়ার মতো কোনো নৌকা পাইনি। বাধ্য হয়ে ১৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি ডিঙি নৌকা কিনেছি। অন্য সময় এগুলো তিন হাজার টাকায় পাওয়া যায়।’

গোয়াইনঘাট উপজেলার আলিরগাঁও এলাকার আজিজ মিয়া বলেন, উপজেলার প্রায় শতভাগ মানুষ পানিবন্দি। কেউ ত্রাণ চায় না, প্রাণে বাঁচতে চায়। কিন্তু তাদের উদ্ধারের জন্য নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না।

আজিজ বলছেন, এমন ভয়ানক দুর্যোগ তিনি গত কয়েক দশকে দেখেননি।

এদিকে প্রবল বৃষ্টিতে উজানের ঢলে একের পর এক এলাকা তলিয়ে বানভাসি মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের উদ্ধারে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মুজিবুর রহমান শনিবার বলেন, অনেক মানুষ পানিবন্দি, কিন্তু নৌকার অভাবে আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে পারছে না।

“বন্যায় অনাহারে থাকা লোকজন এখন কেবল প্রাণে বাঁচতে চান। কিন্তু একটি নৌকা মেলানো তাদের কাছে এখন সোনার হরিণ।”

চলতি মৌসুমে এটা সিলেটে তৃতীয় দফা বন্যা। ভারতের মেঘালয় ও আসামে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে এবার পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা করা হচ্ছে।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের হিসাবে, সিলেট ও সুনামগঞ্জের ৩৫ লাখের মতো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

“আমরা চেষ্টা করছি তাদের উদ্ধার করে এনে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে রাখতে,” বলেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন।

পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী মাঠে নেমেছে। বানভাসি মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হলেও সেখানে মুড়ি ছাড়া খাবার ও পানি জুটছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *