যেদিন দুই শিশুকে বিষ মাখানো মিষ্টি খাওয়ানো হয়, সেদিন মা লিমা আক্তারের সঙ্গে হত্যার পরিকল্পনাকারী সাফিউল্লাহ ১৫ বার ফোনে কথা বলেন। তাদের ফোনকলের সূত্র ধরেই এই হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৭ মার্চ) বেলা ২টায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এই তথ্য জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান।
তিনি বলেন, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঘটনার দিন দুর্গাপুরের বাড়িতে গিয়ে লিমাকে বিষ মাখানো মিষ্টি দেন সফিউল্লাহ। এর পরও লিমার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন তিনি। তার কথামতোই লিমা বড় ছেলেকে তিনটি ও ছোট ছেলেকে দুটি মিষ্টি খাওয়ান। এর পরই দুই শিশু অস্বস্তিবোধ করতে থাকে।
শিশুদের মা লিমা আক্তারকে বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে দুর্গাপুরের বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের বাবা ইসমাঈল হোসেনের করা মামলায় লিমাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়।
জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম দ্বিতীয় আদালতের বিচারক আফরিন আহমেদ হ্যাপীর কাছে বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি স্বাকারোক্তিমূলক জাবনবন্দি দেন বলে জানায় পুলিশ।
এদিকে, আশুগঞ্জের দুর্গাপুর এলাকার নজরপাড়ার বাসিন্দারা এ ঘটনায় জড়িত রিমা এবং তার প্রেমিক সফিউল্লাহর ফাঁসি চেয়েছেন। নজরপাড়ার বাসিন্দা শিউলি আক্তার বলেন, মা হয়ে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে, আমাদের বিশ্বাসই হচ্ছে না। এ ঘটনায় জড়িত রিমা ও সফিউল্লাহর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই আমরা।
নিহত দুই শিশুর বাবা ইটভাটাশ্রমিক ইসমাইল হোসেন সুজন বলেন, দুদিন আগে রিমার কাছে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সিমটি চেয়েছিলাম। রিমা প্রথমে জানায় মোবাইল ও সিম ভেঙে ফেলেছে। মোবাইল না দিলে আমি আত্মহত্যার হুমকি দিই। পরে জানায় মোবাইলসহ সিমটি সফিউল্লাহ সোফাই মিয়ার কাছে। সোফাই মিয়ার কাছে কেন জানতে চাইলে ঝগড়া লেগে যায়। একপর্যায়ে জানায়, তার সঙ্গে সোফাই মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক আছে। তাকে বিয়ে করবে। পথের কাঁটা সরিয়ে দেওয়ার জন্য সোফাই মিয়ার পরামর্শে মিষ্টির সঙ্গে বিষ খাইয়ে আমার দুই সন্তানকে হত্যা করেছে। বুধবার দুপুরে হত্যার কথা আমার কাছে স্বীকার করে রিমা। পরে তাকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুজন বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে জড়িত রিমা এবং তার প্রেমিক সোফাই মিয়ার ফাঁসি চাই। দুই সন্তান হত্যার বিচার না পেলে আমি আত্মহত্যা করবো।’
আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ রহমান বলেন, ১২ বছর আগে ইসমাইল হোসেন সুজন এবং রিমার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের তিন সন্তানের জন্ম হয়। বড় ছেলে জন্মের দুদিন পর মারা যায়। পরবর্তী সময়ে তাদের আরও দুই সন্তান হয়। মেজো ছেলে মোহাম্মদ ইয়াছিন খান এবং ছোট ছেলে মোরসালিনকে নিয়ে চলছিল তাদের সংসার। অভাব-অনটনের কারণে রিমা আশুগঞ্জ উপজেলার এসআলম অটোরাইস মিলে কাজ নেয়। অপরদিকে সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার একটি ইটভাটায় শ্রমিকদের টিকিট বিলির কাজ নেয় সুজন। অভাব-অনটন ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল। এরই মধ্যে রিমা এসআলম অটোরাইস মিলের শ্রমিক সর্দার সফিউল্লাহ সোফাই মিয়ার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। গত সাত মাস ধরে প্রেমের সম্পর্ক চলছিল। এরই মধ্যে রিমাকে বিয়ের আশ্বাস দেয় সফিউল্লাহ। তবে শর্ত জুড়ে দেয়, দুই সন্তানকে ছাড়া বিয়ে করবে। এ অবস্থায় গত ১০ মার্চ বিকাল ৫টার দিকে সফিউল্লাহ বিষ মিশ্রিত পাঁচটি মিষ্টি রিমার কাছে পৌঁছে দেয়।
