ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় দুই শিশুর মৃত্যু নাপা সিরাপ খেয়ে নয়।বরং পরকীয়া প্রেমের জেরে বিষ মেশানো মিষ্টি খাইয়ে সন্তানদের হত্যা করেছেন মা এমনটাই জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় মা লিমা বেগমকে (৪০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ মার্চ) ভোরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরই মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে জবানবন্দির জন্য কোর্টে পাঠিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত দুই শিশুর বাবা ইসমাঈল হোসেন বাদী হয়ে লিমা বেগম ও তার পরকীয়া প্রেমিক সফিউল্লার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
মারা যাওয়া দুই শিশু হলেন, আশুগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে ইয়াছিন খান (৭) ও মোরসালিন খান (৫)।
এদিকে দুই ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবা ইসমাইল হোসেন। তাদের মৃত্যুর সময় তিনি ঘরে ছিলেন না। কিন্তু নানা ঘটনায় তার মনে সন্দেহ হয়, স্ত্রীর বর্ণনায় কোনো একটা সমস্যা আছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ইসমাইলের সঙ্গে কথা হয় গণমাধ্যমের। পুলিশ যে বর্ণনা দিয়েছে, তার সঙ্গে শিশু দুটির বাবা ইসমাইলের বক্তব্যে মেলে পুরোপুরি।
তিনি বলেন, ‘মিলে কাজ করার সময় আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিল সর্দার সফিউল্লা বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সফিউল্লা তার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘনিষ্ঠ হন। একপর্যায়ে লিমাকে পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেন সফিউল্লা। পরিকল্পনা করেন দুই ছেলেকে হত্যার।
‘এই পরিকল্পনা অনুসারেই লিমা বিষ মেশানো মিষ্টি খাওয়ায় দুই ছেলেকে। পরে ওষুধ খাইয়ে প্রচার করে সিরাপের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।’
ইসমাইল জানান, ঘটনার দিন তিনি সিলেটে ছিলেন। তাকে ফোন করে জানানো হয় দুই ছেলে অসুস্থ। গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি তিনি থানায় যান। সেখানে গিয়ে দুই ছেলের নিথর দেহ পড়ে থাকার কথা শোনেন। এরপর তাকে বাড়িতে নেয়া হয়।
স্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়ে আগে জানতেন না দাবি করে ইসমাইল বলেন, পুলিশ এসে বাড়িতে যে মোবাইল ছিল, সেটা চায়। তিনি লিমাকে সেটি দিতে বলেন, কিন্তু লিমা বলে তার কাছে ফোন নেই; মিলের সর্দার নিয়ে গেছে। তখন প্রথম তার সন্দেহ হয়। বিষয়টি তিনি চেয়ারম্যানকে জানান।
এরপর পুলিশ এসে তার স্ত্রীকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করে।
ইসমাইল বলেন, ‘আমার মনে হয় দুই ছেলে তাদের মাকে সফিউল্লার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলেছিল। এ জন্য প্রথমে তাদের হত্যা করা হয়েছে। পরে হয়তো আমাকেও মেরে ফেলা হতো।’
হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, “আমার ছোট ছোট দুই ছেলেকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে। আমার স্ত্রী থানায় আমাকে বলছে, ‘আমাকে বাঁচাও’, কিন্তু আমি তাকে বলছি, আমি তোমার ফাঁসি চাই। আমি সফিউল্লারও ফাঁসি চাই।”
উল্লেখ্য, অভিযোগ ওঠে, ‘নাপা সিরাপ খেয়ে’ ১০ মার্চ দিবাগত রাতে শিশু দুুটি মারা যায়। ওই সময় শিশুদের মা রিমা বেগম দাবি করেন, ‘দুদিন ধরে মোরসালিন খানের জ্বর হয়। এর আগে থেকে ইয়াসিন খানেরও জ্বর ছিল। ঘটনার দিন বিকেলে দুই শিশুর দাদি পাশের বাজারের মাঈন উদ্দিনের ফার্মেসি থেকে নাপা সিরাপ নিয়ে আসেন। দুই শিশুকে সিরাপ খাওয়ানোর পর তারা বমি করতে শুরু করে।’
‘অবস্থার অবনতি হলে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের জেলা সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলে পথে রাত ৯টার দিকে ইয়াসিনের মৃত্যু হয়। পরে রাত ১০টার দিকে মোরসালিনও মারা যায়।’
এ ঘটনায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
সেই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘নাপা সিরাপ’ বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেয় জেলা কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের যে ফার্মেসি থেকে নাপা সিরাপ কেনা হয়েছিল, সেখান থেকে জব্দ করা বাকি সিরাপ পরীক্ষায় মান সঠিক পাওয়া গেছে বলে জানায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
