বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো ও অবৈধভাবে মজুত করার বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ইতোমধ্যে তারা সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের তালিকা করেছেন। তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গুদামে নজরদারি করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে প্রতিটি পাইকারি বাজারে সাদা পোশাকে নজরদারি করা হচ্ছে। যেসব ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সদস্য হয়ে অধিক মুনাফার আশায় বাজারে সংকট তৈরি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিকবার বৈঠকও করেছেন।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আমরা বাজারের অসাধু ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ড মনিটরিংয়ের কাজ শুরু করেছি। গোয়েন্দা পুলিশের সব ইউনিটকে এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে সিন্ডিকেট তৈরি করে কোনও পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সেজন্য নজরদারি চলছে। প্রয়োজনে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার পর আরও সংকট দেখিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রি করছে। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি দেখতে বলা হয়। এই নির্দেশনার পরপরই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গোয়েন্দা ইউনিটকে অসাধু ব্যবসায়ীদের ধরতে নজরদারি করতে বলে।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তারা ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকার ভেতরে যত পাইকারি বাজার রয়েছে, সেই তালিকা করে বাজার অনুযায়ী আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের তালিকা করা শুরু করেছেন। কে কোন পণ্য আমদানি-রফতানি করে, সেই তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি কার কোথায় গুদাম রয়েছে, তা জানার চেষ্টা চলছে। ছদ্মবেশে বা ক্রেতা সেজে সাদা পোশাকে গোয়েন্দারা এসব পাইকারি মার্কেট থেকে পণ্য কেনার পর, সংকট তৈরির মূল হোতাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, প্রতি বছর রমজান আসার আগে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পণ্য গুদামজাত করে বাজারে সংকট তৈরি করে। পরে তা বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করে। চলতি বছরও আসছে রমজানের আগেই বাজার কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ঢাকার বাইরে থেকে আনা পণ্য কেন দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন রামজান মাসকে ঘিরে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। এই সিন্ডিকেট সরকারকে বেকায়দায় ফেলে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে পারে। তাই এখন থেকেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিলে সরকারের ভাবমূর্তি ব্যপকভাবে ক্ষুন্ন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
ইতোমধ্যে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ঢাকার বাইরে থেকে আনা পণ্য কেন দিগুণ বা তিন গুণ দামে বিক্রি হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এজন্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, ঢাকার বাইরে থেকে পণ্য আসার ক্ষেত্রে পথের সকল ভোগান্তি বিশেষ করে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। এছাড়া বিদেশ থেকে যারা পণ্য আমদানি করে থাকে, তাদের পণ্য খালাসে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খালাস করে বাজারে নেওয়ার সুবিধার কথা বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে টিসিবির মাধ্যমে আরও বেশি পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে পারলে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিষয়েও জোর দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এ বিষয়ে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘বাজারে এমনভাবে নজরদারি করতে হবে যাতে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি না হয়, আবার অসাধু ব্যবসায়ীরাও যাতে কোনও কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে। অর্থাৎ দুষ্ট দমনের পাশপাশি শিষ্টের পালন করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের দমনের পাশাপাশি ভালো ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দিতে হবে। খারাপ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই বাজারে একটা স্থিতিশীল পরিবেশ আসতে পারে।’
