ইভ্যালির ভবিষ্যৎ কী, গ্রাহকরা কি টাকা ফেরত পাবেন?

বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে কেলেঙ্কারি যে প্রতিষ্ঠানটি দিয়ে শুরু, সেই ইভ্যালির বিরুদ্ধে মামলা গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন চাওয়া হলে ইভ্যালিকে পুনরায় বাজারে আনতে ও গ্রাহকদের টাকা ফিরিয়ে দিতে ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করেন হাইকোর্ট।

সেই বোর্ডের অগ্রগতি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হয়েছিলেন এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন: প্রায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ইভ্যালির দায়িত্ব পেলেন। কয়েক মাস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অগ্রগতি কতটুকু?

এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক: ভোক্তাদের ভোগান্তির কথা ভেবে হাইকোর্ট এই বোর্ড গঠনের গণমুখী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির এ পর্যায়ে আসার পেছনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যর্থতা তো রয়েছেই, তাদের অনেক আগেই ই-কমার্সের জন্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল। যেটি ইদানিং করা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত আসছে। তবে এগুলো আগেই করা উচিৎ ছিল। তাহলে হাজার হাজার মানুষ প্রতারিত হতো না। আমি দেখলাম, এখানে (ইভ্যালিতে) প্রতারণার মহোৎসব চলছিল। ক্রেতাদেরও সতর্ক থাকা উচিৎ ছিল। সরকারেরও উচিৎ ছিল নিয়ন্ত্রণটা আগে থেকেই হাতে রাখার।

প্রশ্ন: ইভ্যালির দেনা ও সম্পদের তারতম্য কী অবস্থায় রয়েছে?

এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক: ইভ্যালির সম্পদের চেয়ে দেনার পরিমাণ অনেক বেশি। এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠানটিতে দুই ধরনের পাওনাদার রয়েছেন। প্রথমত, যারা জিনিসপত্র কিনতে টাকা দিয়েছেন। তাদের পাওনার পরিমাণ কম। দ্বিতীয়ত, যারা ইভ্যালির কাছে পণ্য বাকিতে বিক্রি করেছে। অর্থাৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের পাওনা সবচেয়ে বেশি।

প্রশ্ন: ইভ্যালি নিয়ে কি আপনারা এখনও পুরোপুরি অন্ধকারেই আছেন?

এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক: বলতে পারেন, এখন আমরা ৮০ ভাগ অন্ধকারে আছি। সার্ভারটা খোলা সবচেয়ে জরুরি। তা না করায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। অডিট না করানো পর্যন্তও সঠিক তথ্য আসছে না।

প্রশ্ন: কী ধরনের ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে?

এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক: ইভ্যালির সার্ভার পরিচালনা করতো অ্যামাজন। কয়েক কোটি টাকা পাওনা থাকায় তারা সার্ভার বন্ধ রেখেছে। কিন্তু সঠিক তথ্য বের করতে সার্ভারটি ওপেন করা জরুরি। আমরা সেই চেষ্টা করছি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি অডিট করাতে হবে। কোম্পানিটিতে যাওয়া-আসা এখন পর্যন্ত নিজেদের খরচে করছি। তবে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার তথ্য পেয়েছি। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে চলমান ব্যয় মেটাতে ওই টাকা তোলা হবে। ৩০ জন কর্মচারী, অফিস ভবন ও গুদামের ভাড়াও ওই টাকায় দিতে হবে।

প্রশ্ন: ইভ্যালির ভবিষ্যৎ কী?

এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক: এ মূহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে আশা করছি, ছয় মাস পর একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবো।

প্রশ্ন: গ্রাহকরা কি টাকা ফেরত পাবেন?

এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক: টাকা ফেরতের বিষয়ে আমরা প্রতিষ্ঠানটির আয় ও দায় সমন্বয় করার চেষ্টা করছি। কিছু টাকা কম দিয়ে বা কে আগে কে পরে পাবে সেসব বিবেচনায় নিয়ে কাজ করবো। তবে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আগে সাধারণ ক্রেতাদের পাওনা পরিশোধ করা হবে।

সাভারের তিনটি গোডাউনে বেশ কিছু মালামাল পড়ে আছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো বিক্রি করেও কিছু টাকা তোলা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটির গেটওয়েতে আনুমানিক প্রায় ২৫ কোটি টাকার মতো জমা রয়েছে। সকল ব্যাংকে ইভ্যালির কত টাকা জমা আছে তা আমাদের জানাতে হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে। রাসেল ও তার স্ত্রীর সম্পদের মধ্যে ইভ্যালির কোনও সম্পদ ঢুকেছে কিনা সে তথ্যও হাইকোর্ট জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইভ্যালির ২৪টি গাড়ির মধ্যে ১৪টির সন্ধান পেয়েছি। বাকিগুলোর সন্ধান এখনও পাইনি। এর মধ্যে বিলাসবহুল গাড়িগুলো বিক্রি করা হবে। বাকিগুলো ভাড়ায় দেওয়া হবে।

প্রশ্ন: টাকা ফেরত দিতে বোর্ড কতদিন সময় নিতে পারে?

এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক: আমাদের কমপক্ষে আরও ছয় মাস প্রয়োজন।

এখনো আশায় প্রতারিত গ্রাহকেরা

ঢাকার বাসিন্দা আঁখি আক্তার গত বছরের মে মাসে আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি থেকে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কেনার জন্য অগ্রীম মূল্য হিসেবে ৩৩ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।

”আমি জানতাম, পণ্যটা পেতে হয়তো তিন বা চার মাস লেগে যাবে। কিন্তু অর্ধেক দামে পাচ্ছি বলে সেটা মেনে নিয়েছিলাম। তারপরেই তো ঝামেলা শুরু হয়ে গেল, ইভ্যালিই বন্ধ হয়ে গেল। এখন টাকাও ফেরত পাব কিনা, সেটাই জানি না,” বলছিলেন আঁখি আক্তার।

তার মতো ইভ্যালির দুই লাখ গ্রাহক রয়েছে, যাদের অনেকের অর্থ আটকে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কাছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ই-কমার্স পরিচালনা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির হিসাবে, গ্রাহক, মার্চেন্ট ও অন্যান্য সংস্থার কাছে ইভ্যালির দেনা ৫৪৩ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির দুই লাখের বেশি গ্রাহক রয়েছে।

ইভ্যালির ওয়েবসাইট ও অ্যাপস বন্ধ রয়েছে। ফেসবুক পাতাতেও গত বছরের ১৮ই অক্টোবরের পর নতুন কোন আপডেট আসেনি।

ফলে প্রতিষ্ঠানটির লাখ লাখ গ্রাহক ও মার্চেন্ট তাদের পাওনা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা মেঘলা হক একটি ফ্রিজ কেনার জন্য ৩৭ হাজার টাকা ইভ্যালিতে জমা দিয়েছেন। এছাড়া গিফট কার্ড, মুদি পণ্য মিলিয়ে আরও ১০ হাজার টাকার পণ্যের জন্য তিনি অর্থ পরিশোধ করেছেন।

মেঘলা হক বলছেন, ”আগে একবার অর্ডার দিয়ে একটা ওয়াশিং মেশিন পেয়েছি। সেই বিশ্বাস থেকে ফ্রিজসহ আরও কিছু পণ্যের অর্ডার দিয়েছিলাম। কিন্তু এমনভাবে বিপদে পড়বো ভাবি নাই। জুলাইয়ের পরে একটা অর্ডার আছে, সেটার টাকা হয়তো পেলেও পেতে পারি। কিন্তু আগের টাকার কি হবে, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।”

”ভেবেছিলাম নতুন পরিচালনা কমিটি হয়েছে, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এখনো সেই আশায় আছি,” বলছেন মেঘলা হক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *