রাজনীতি বুঝি না, মানুষের জন্য কাজ করতে চাই : ঋতু

বিনোদন ডেস্ক- ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে প্রায় দ্বিগুণ ব্যবধানে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ট্রান্সজেন্ডার নজরুল ইসলাম ঋতু। দেশে তিনিই প্রথম ট্রান্সজেন্ডার, যিনি ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

 

আনারস প্রতীকে ঋতুর বিশাল জয়ে উচ্ছ্বসিত তার সমর্থকরা। নৌকার প্রার্থীও পরাজয় মেনে নিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ঋতুকে।
নতুন চেয়ারম্যান বলছেন, সবাইকে পাশে নিয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন।

 

ইউপি নির্বাচনে ঋতু পেয়েছেন ৯ হাজার ৫৫৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রার্থী নজরুল ইসলাম ছানা পেয়েছেন ৪ হাজার ৫২৯ ভোট। তৃতীয় স্থানে থাকা হাতপাখার মাহবুবুর রহমান পেয়েছেন ৮০৯ ভোট।

 

তবে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে এ পর্যন্ত আসার সংগ্রামটা সহজ ছিল না নজরুল ইসলাম ঋতুর। এসব বিষয় নিয়ে এক জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে কথা বলেছেন নজরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-

 

প্রশ্ন: আপনাকে অভিনন্দন জানাই। তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হলেন। আপনার অনুভূতি কেমন?

নজরুল ইসলাম ঋতু: আমি ভীষণ আনন্দিত। এলাকার মানুষ আমাকে বড় সম্মান দিয়েছে। এ জন্য তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। তাদের সবার সমর্থন না পেলে এ বিজয় হতো না। আমি দ্বিগুণের বেশি ভোট পেয়েছি আমার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে। এটা আমার প্রতি মানুষের সমর্থন তুলে ধরে।

 

প্রশ্ন: আমাদের সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের চলার পথটা সহজ না, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকারের নিম্নতম স্তর। কিন্তু সেখানেও একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের নির্বাচিত হওয়াটা খুব সহজে হয়নি নিশ্চয়ই।

নজরুল ইসলাম ঋতু: আমি তো জনগণের মধ্যে আছি। জনগণ চেয়েছে নির্বাচন করার জন্য, করেছি। জনগণ চেয়েছে তাই জয়ী হয়েছি। তবে প্রথমে এলেই তো কেউ জায়গা দিয়ে দেয় না। মেহনত করতে হয়েছে। তাদের জন্য কিছু করতে হয়েছে। তারপরই না তারা আমার ওপর আস্থা রেখেছে।

 

প্রশ্ন: অনেক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ প্রার্থিতার ফরমে নারী-পুরুষের মধ্যে নারী হিসেবে পরিচয় দেন। অন্যান্য বা হিজড়ার জায়গা ব্যবহার করেন না। আপনি কী করেছিলেন?

নজরুল ইসলাম ঋতু: আমার জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘নজরুল হিজড়া’ লেখা আছে। আমি নিজেও প্রার্থিতার ফরমে হিজড়া পরিচয় লিখেছি।

 

প্রশ্ন : নির্বাচনে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় কীভাবে এলেন? কী যোগ্যতায় আপনাকে মানুষ আস্থায় নিল?

নজরুল ইসলাম ঋতু: আমি আসলে কোনো লেখাপড়াও জানি না। শুধু নিজের নামটা স্বাক্ষর করতে জানি। বড় কথা বলে লাভ নেই। জনগণ ভালোবেসেছে বলেই আমি এ জায়গায় এসেছি। প্রতিনিধি হয়েছি। তবে আমি সব সময় মানুষের জন্য কাজ করেছি। এই এলাকাতেই আমার জন্ম। এখানেই বেড়ে ওঠা। এরপর ঢাকায় চলে গেছি।

 

কিন্তু যখন এলাকায় আসতাম, তখন মানুষের জন্য কিছু না কিছু করার চেষ্টা করতাম। মেয়েদের বিয়ের সময় সহায়তা দিয়েছি, কেউ অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়িয়েছি। এলাকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা দিয়েছি। রাস্তাঘাট করতেও আমি মানুষের পাশে থেকেছি। তখনই মানুষ ভেবেছে, এসব যখন করছে, তখন তো প্রতিনিধি হলে আরও কিছু করতে পারবে।

 

প্রশ্ন: এবারই প্রথম নির্বাচন করলেন। তো নির্বাচনে প্রতিপক্ষের যারা ছিল, তারা আপনার এই পরিচয় নিয়ে কিছু বলেনি?

নজরুল ইসলাম ঋতু: হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার পরিচয় নিয়ে নানা কথা হয়েছে। আমি হিজড়া, আমাকে ভোট দিলে কোনো কাজ করতে পারব না। এলাকায় থাকতে পারব না। আমি কী সেবা করব, আমার তো চেয়ারম্যান বা এসব বিষয় নিয়ে কোনো ধারণাই নেই—এসব নানা প্রচারণা হয়েছে। অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করেছি। হিজড়া না হলে এমন করে হয়তো কেউ বলতে পারত না।

 

কিন্তু এটা তো মৌখিক হেনস্তা। এর পাশাপাশি, আমার অনেক মানুষকে রীতিমতো মার পিট করা হয়েছে। আমার আত্মীয়স্বজনকে মারা হয়েছে। তারা আহত হয়েছে। তাদের সুস্থ করতে আমার খরচও হয়েছে। আমাকে এলাকায় প্রায় বেরোতেই দেওয়া হয়নি। তবে আমি বারবার বলেছি, আমাকে মারুক। মেরে যদি কেউ ভালো থাকতে চায়, থাকুক। যদি ভালোভাবে নির্বাচন করতে দেওয়া হতো, তবে আমি আরও বেশি ভোটে জিততাম।

 

প্রশ্ন: নির্বাচিত হওয়ার পর এখন আপনার পরিকল্পনা কী?

নজরুল ইসলাম ঋতু: এখন এলাম কেবল। দেখি কী কী করা যায়। মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। সেবা করতে চাই। অত রাজনীতি বুঝি না। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিনীতভাবে বলতে চাই, উনি আমাদের স্বীকৃতি দিতে পেরেছেন। তাঁর সুনজর প্রত্যাশা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *