‘বন্দরের রাজা’ ভ’য়ংকর আকবর

নজর২৪ ডেস্ক- নায়কোচিত চেহারা। সিলেটের জনপ্রিয় একটি ইউটিউব চ্যানেলে অভিনয়ও করতেন নায়কের। নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরতেন সমাজের নানা অসঙ্গতি। স্লোগান দিতেন সমাজ বদলানোর। অভিনেতা আকবর হোসেন ভূইয়ার অভিনয় দেখে অনেকেই তাকে জানতেন একজন সৎ পুলিশ সদস্য হিসেবে। কিন্তু গত শনিবার রাতে মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য ফাঁড়িতে নির্যাতন করে রায়হান উদ্দিন নামের এক যুবককে খুনের ঘটনার পর বের হয়ে আসতে শুরু করে আকবরের ভয়ংকর রূপ।

 

রায়হানের মৃত্যুর পর বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেনসহ চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রত্যাহার করা হয়েছে আরও তিনজনকে। রায়হানের মৃত্যুর জন্য আকবরসহ ফাঁড়িতে কর্মরত সদস্যদের দায়িত্বহীনতা দায়ি ছিল বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোর্তিময় সরকার। সিলেট নগরীর বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বন্দরবাজার এলাকা ঘিরে ছিল এসআই আকবরের রাজত্ব। ওই এলাকার অপরাধীদের নিয়ে ছিল তার সিন্ডিকেট- এমন তথ্য মিলেছে বিভিন্ন সূত্র ও ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে।

 

সিলেট নগরীর নেহারিপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাকে ছিনতাইকারী সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন এসআই আকবর। নগরীর কাস্টঘরে ছিনতাই করতে গিয়ে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন তিনি। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ফুটেজে গণপিটুনির কোন প্রমাণ মেলেনি।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফাঁড়িতে আটকে রেখে রায়হানকে নির্যাতনের সময় সে চিৎকার করছিল। নির্যাতন না করে মেরে না ফেলতে পুলিশ সদস্যদের অনুরোধ করছিল। বন্দরবাজার ফাঁড়ির লাগোয়া কুদরত উল্লাহ বোর্র্ডিং। ওই বোর্ডিংয়ের ১০২ নম্বর রুমে থাকেন ব্যবসায়ী হাসান আহমদ জানান, রাতে তিনি তার এক আত্মীয়কে ঢাকার বাসে তুলে দিতে কদমতলী টার্মিনালে যান। ফিরে আসার পর তিনি শুনতে পান ফাঁড়ির ভেতরে কেউ চিৎকার করছে। আকুতি জানিয়ে বলছে, ‘আমি চোর-ডাকাত নয়, আমাকে আর মেরো না।’ পরে তিনি সকালে জানতে পারেন আগের রাতে ফাঁড়িতে রায়হান উদ্দিনকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার ঘটনা।

 

অভিযোগ রয়েছে কোন কাজে এসআই আকবরের কাছে গেলে তিনি টাকা ছাড়া কথা বলতেন না। কাজিরবাজার মাদ্রাসার শিক্ষক ফুয়াদ আদনান জানান, তার এক বন্ধুর একটি কাজের জন্য তিনি একবার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে গিয়েছিলেন। এসআই আকবর তাদেরকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে বসেন। কাজটি করে দেওয়ার জন্য তিনি একলাখ টাকা দাবি করেন। এনিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় এসআই আকবর তাকে ফোন করে হুমকি দেন। হুমকি পেয়ে তিনি স্ট্যাটাসটি মুছতে বাধ্য হন।

 

সিলেট নগরীর মহাজনপট্টির ব্যবসায়ীরা জানান, লকডাউনের সময় বাংলাদেশ পুলিশ যখন মানবিক কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করে তখনো চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া ছিলেন এসআই আকবর। লকডাউনের সময় মহাজনপট্টিতে দোকান খুলতে হলে অনুমতি লাগতো এসআই আকবরের। দোকানের এক সার্টার খুললে এক হাজার টাকা ও দুই সার্টার খুললে দুই হাজার টাকা করে দিতে হতো তাকে।

 

সিলেট নগরীর বন্দরবাজার এলাকা ঘিরে ছিল এসআই আকবরের অপরাধরাজ্য। হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, অসামাজিক কাজের জন্য হোটেল থেকে মাসোয়ারা, জুয়াড়ি, ছিনতাইকারী ও মাদকব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে অর্থ আদায়। রাতে রাস্তা থেকে নিরীহ লোকজনদের ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে মাদক ও অবাঞ্চিত নারীদের দিয়ে আটক দেখানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল এসআই আকবরের নিত্যদিনের ঘটনা।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হকার নেতা জানান, বন্দরবাজার ফাঁড়ির আওতাভূক্ত এলাকায় ৮০০-৯০০ ভাসমান হকার রাস্তা ও ফুটপাতে বসেন। প্রত্যেক হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০-৫০ টাকা করে চাঁদা ওঠাতেন এসআই আকবর। তার পক্ষে কনস্টেবল জিয়া এই চাঁদা তুলতেন। সম্প্রতি জিয়া শিবেরবাজার ফাঁড়িতে বদলি হয়েছেন।

 

এছাড়া সুরমা মার্কেটের ২টি, মহাজনপট্টি ও কালিঘাটের ২টি ও জিন্দাবাজারের ২টি হোটেল থেকে মাসে ২০ হাজার টাকা করে মাসোয়ারা আদায় করতেন তিনি। এছাড়া কাস্টঘর, কিনব্রিজের নিচ ও কালিঘাট এলাকায় মাদক কারবারি ও জুয়াড়িদের (শিলং তীর) কাছ থেকে সপ্তাহভিত্তিতে টাকা আদায় করতেন বলেও অভিযোগ আকবরের বিরুদ্ধে।

 

প্রসঙ্গত, গত রোববার সকালে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রায়হান উদ্দিন মারা যান। তিনি সিলেট নগরের আখালিয়া নেহারিপাড়া এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছেন রায়হান।

 

বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান উদ্দিনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে নিহতের পরিবার। এ ঘটনায় রোববার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি।

 

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রতিদিনের মতো গত শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে রায়হান আহমদ নিজ কর্মস্থল নগরীর স্টেডিয়াম মার্কেটের ডা. গোলাম কিবরিয়া ও ডা. শান্তা রানীর চেম্বারে যান। পরদিন রোববার (১১ অক্টোবর) ভোর ৪টা ৩৩ মিনিটে ০১৭৮৩৫৬১১১১ মোবাইল নম্বর থেকে রায়হানের মা সালমা বেগমের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল দিলে সেটি রিসিভ করেন রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ।

 

এ সময় রায়হান আর্তনাদ করে বলেন, তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আছেন। তাকে বাঁচাতে দ্রুত টাকা নিয়ে বন্দর ফাঁড়িতে যেতে বলেন রায়হান। এ কথা শুনে রায়হানের চাচা ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে রায়হান কোথায় জানতে চাইলে দায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্য বলেন, সে ঘুমিয়ে গেছে। আর যে পুলিশ সদস্য রায়হানকে ধরে নিয়ে এসেছেন তিনিও চলে গেছেন। এ সময় হাবিবুল্লাহকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফাঁড়িতে আসার কথা বলেন ওই পুলিশ সদস্য।

 

পুলিশের কথামতো হাবিুল্লাহ আবারও সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফাঁড়িতে গেলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য জানান, রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর রায়হানের চাচা ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রায়হানকে সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি মারা যান। হাবিবুল্লাহ পরিবারের অন্য সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনকে খবর দিলে তারা গিয়ে ওসমানীর মর্গে রায়হানের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ দেখতে পান।

 

এজাহারে মামলার বাদী উল্লেখ করেন, আমার স্বামীকে কে বা কারা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে গিয়ে পুলিশি হেফাজতে রেখে হাত-পায়ে আঘাত করে এবং হাতের নখ উপড়ে ফেলে। পুলিশ ফাঁড়িতে রাতভর নির্যাতনের ফলে আমার স্বামী মৃত্যুবরণ করেন।

 

সিলেটের চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত ভার পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

এদিকে এ ঘটনায় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)।

 

সাময়িক বরখাস্ত চার পুলিশ সদস্য হলেন- বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাস। আর প্রত্যাহার তিন পুলিশ সদস্য হলেন- এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজিব হোসেন।

 

এ ঘটনায় এসএমপি গঠিত তদন্ত কমিটি জানতে পারে, রোববার রাত ৩টায় আহত অবস্থায় রায়হানকে উদ্ধার করে সিলেট নগরের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে এনে রাখে পুলিশ। আহত হওয়ার পরও তাকে হাসপাতালে না নিয়ে পুলিশ ফাঁড়ির হাজতে রাখা হয় এবং আইনগত কোনো পদ্ধতি অনুসরণ না করা হয় না।

 

সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী বলেন, রোববার (১১ অক্টোবর) বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে আখালিয়া এলাকার রায়হান উদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে- এমন অভিযোগ পেয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়া স্যার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

 

কমিটির প্রধান করা হয় এসএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) শাহরিয়ার আলম মামুনকে। কমিটিতে কোতোয়ালি মডেল থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার নির্মলেন্দু চক্রবর্তী ও এয়ারপোর্ট থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার প্রভাষ চন্দ্রকে সদস্য করা হয়। তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই শাস্তিমূলক এই ব্যবস্থা নেয় এসএমপি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *