নজর২৪ ডেস্ক- উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের সবগুলো গেট খুলে দেওয়ায় লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বুধবার (২০ অক্টোবর) ভোর থেকে তিস্তার পানি বাড়ায় লালমনিরহাটের তিন উপজেলার তিস্তার চর এলাকায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর ধানক্ষেত। পানির তোড়ে ভেঙে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় পরিবারগুলো উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাট বাইপাস সড়কও হুমকির মুখে পড়েছে।
আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তিস্তা শুকিয়ে জেগে উঠেছিল চর। হঠাৎ তিস্তার পানিতে সব ডুবে গেছে। কার্তিক মাসে এমনভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে চরাঞ্চলের মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সূত্র জানায়, মঙ্গলবার (১৯ অক্টোবর) রাত থেকে তিস্তার পানি বেড়ে ডালিয়া পয়েন্টে ৫২ দশমিক ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। বুধবার (২০ অক্টোবর) সকাল ৯ টায় ওই পয়েন্টে ৫৩ দশমিক ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপরে। তিস্তার পানি ক্রমেই বাড়ছে।
এদিকে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, পাটগ্রামের দহগ্রাম, সিঙ্গামারি, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, শৈইলমারী, নোহালী, চর বৈরাতি তিস্তা নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করে প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান জানান, এলাকার জিরো পয়েন্টে তিস্তার ডান তীর ও গ্রোয়েন বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রোয়েন বাঁধটির ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ওই বাঁধটি ভেঙে গেলে ডান তীর বাঁধসহ এলাকার শত শত ঘরবাড়ি তিস্তার পানিতে ভেসে যাবে।
টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ময়নুল হক বলেন, ‘পরিস্থিতি খুব খারাপ। এরই মধ্যে তিস্তাবাজার, তেলিরবাজার, দোলাপাড়া, চরখড়িবাড়ি এলাকা তলিয়ে গেছে। চরের ফসলের জমি সব পানির নিচে। ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদে সরে গেছে।’
খালিশাচাঁপানী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, ‘কার্তিক মাসের এমন হঠাৎ বন্যা এলাকাবাসীকে পথে বসিয়ে দিচ্ছে। এলাকার ছোটখাতা, বাইশপুকুর, সুপারীপাড়া গ্রাম এখন নদীতে পরিণত হয়েছে।’
ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, ‘ভেন্ডাবাড়ি ছাতুনামা ফরেস্টের চর এলাকার ওপর দিয়ে এখন তিস্তা নদীর পানি বয়ে যাচ্ছে। ঘরবাড়িতে গলা সমান পানি। এ ছাড়া নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার ২২টি চরের ৫০ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।’
হঠাৎ তিস্তায় পানি বেড়ে বন্যা সৃষ্টি হওয়ায় চরাঞ্চলের সবজিসহ ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পানিবন্দি পরিবারগুলো শিশু, বৃদ্ধ ও গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
চরাঞ্চলের রমজান আলী বলেন, ‘রাতে হঠাৎ তিস্তার পানি বেড়ে যাবে ভাবতে পারিনি। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, ভেবে পাচ্ছি না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন আগে কোনো রকম ঘোষণা দেয়নি যে বাড়ি থেকে সরে যেতে হবে। পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে আছি।’
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশফাউদ্দৌলা প্রিন্স বলেন, ‘উজানের ঢলে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রেখেও পানি সামাল দেয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। যেকোনো সময় তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড ফিউজ বিধ্বস্ত হতে পারে। আমরা তিস্তা অববাহিকায় লাল সংকেত দিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলেছি।’
তিস্তা ব্যারেজ কন্ট্রোল রুম ইনচার্জ নুরুল ইসলাম জানান, ভারতে ভয়াবহ বন্যার কারণে বুধবার (২০ অক্টোবর) সকালে হঠাৎ করে ব্যারেজ পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। সকাল ৬টায় ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
