নজর২৪ ডেস্ক- ৯০’র দশকের মাঝামাঝিতে অ্যামাজন, ইবে, রাকুতেন এবং পরবর্তীতে আলিবাবার হাত ধরে ই-বাণিজ্যের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের ব্যবধানে এসব প্রতিষ্ঠান এখন এই খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
তাদের ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সবক’টি দেশে। একইসাথে ধরে রেখেছে সারাবিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আস্থা। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছর ঘরে বসে অনলাইনে পণ্য কেনাকাটা বা ই-কমার্স ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
করোনাকালে এটির বিস্তৃতি হয়েছে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। কিন্তু কোন ধরণের লাইসেন্সিং, নীতিমালা, বাধ্যবাধকতা, জবাবদিহিতা না থাকায় প্রতারকদের হাতে চলে গেছে দেশের সম্ভাবনাময় এই খাতটি।
সারাবিশ্বে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যখন ই-কমার্স বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই সময় বাংলাদেশে একের পর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। গ্রাহকরা টাকা তো ফেরত পাচ্ছেনই না, প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের কোনো বিচারও হচ্ছে না।
আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসম্ভব অফার ঘোষণা, ক্রেতাদের লোভকে পুঁজি করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হলেও গ্রাহকের টাকা ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
আবার এখনো ধরাছোয়ার বাইরে আছে এমন শত শত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠার পর গোটা খাতটি এখন ভুগছে আস্থার সংকটে।
জানা যায়, দেশে বর্তমানে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। আর এফ-কমার্স (ফেসবুকভিত্তিক) আছে আরও ৫০ হাজারের বেশি। কোটি কোটি মানুষের হাতে হাতে থাকা ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে সহজেই পণ্য সামগ্রী ভোক্তাদের হাতে পৌঁছে দেয়ার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকচক্র রাতারাতি অনলাইনে পণ্য সরবরাহ ও পরিষেবার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
প্রশিক্ষিত, অপ্রশিক্ষিত, প্রতারণার উদ্দেশ্যে যে যেভাবে পেরেছে ইচ্ছেমত একটি ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুকে পেজ খুলে শুরু করেছে ই-কমার্স ব্যবসা। যার জন্য প্রয়োজন হয়নি কোন লাইসেন্স, নেই কোন নীতিমালা, জবাবদিহিতাও নেই কারো কাছে।
ফলে পণ্যের নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক দামে, কখনো পণ্যের সমপরিমাণ ক্যাশব্যাকসহ অসম্ভব ও লোভনীয় অফার ঘোষণা করে ক্রেতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। গ্রাহকরাও লোভনীয় এসব অফার পেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে।
এ যেন অনলাইন মাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রতারণার নতুন ফাঁদ। যার প্রথমটি ধরা পড়ে আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকের কাছে হাজার কোটি টাকা দেনার বিপরীতে মূলধন মাত্র ৬১ কোটি টাকা। বাকী টাকা কোথায় তার কোন সদুত্তর নেই।
এরপর একে একে বের হতে থাকে ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, সিরাজগঞ্জ শপ, রিং আইডি, কিউকম, আলাদিনের প্রদীপ, বুম বুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, দালাল প্লাস, বাজাজ কালেকশন, টুয়েন্টিফোর টিকেট ডট কম, গ্রিন বাংলা, এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড এ্যাগ্রো ফুড এন্ড কনজ্যুমারস, গ্লিটার্স আরএসটি ওয়ার্ল্ডসহ অন্তত: ১৯টি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার তথ্য।
এর মধ্যে ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করেছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। তবে প্রতারণার মাধ্যমে যাদের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে সেই গ্রাহকরা আদৌও তাদের টাকা ফেরত পাবে কিনা সে বিষয়ে নেই কোন নিশ্চয়তা।
প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা বলছেন, শেয়ারবাজার লুণ্ঠন থেকে শুরু করে এমএলএম মার্কেটিং, যুবক-বিসমিল্লাহ গ্রুপ থেকে এখন ইভ্যালি, ধামাকা, ই-অরেঞ্জ, রিংআইডি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সাধারণ ভোক্তা ও এজেন্টরা। মানুষ নিঃস্ব ও প্রতারিত হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে যে সব আইনগত উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেয়া হয় তাতে বেহাত হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার বা প্রতারিত ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো সাফল্য দেখা যায়নি।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, যারা প্রতারণা করেছে, তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এই ধরনের প্রতারণা সামনের দিনে ঘটতেই থাকবে। এর ফলে ই-কমার্স খাত মানুষের মানুষের আস্থা হারাবে।
এদিকে ই-কমার্স খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ও প্রতারণা ঠেকাতে একটি নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এই বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, দেশের ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা আনতে একটি রেগুলেটরি কমিশন গঠন করা হবে। ডিজিটাল প্রতারণা হলে যেন বিচার করা যায়, সেজন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এবং মানি লন্ডারিং অ্যাক্টে কিছু সংশোধন আনতে হবে। সেই ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি। প্রতিটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন ছাড়া ই-কমার্স ব্যবসা করা যাবে না।
ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে লাখ লাখ গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাণিজ্যমন্ত্রী ধারণা করছেন, এই প্রতিষ্ঠানটির আর গ্রাহকদের টাকা ফেরৎ দেয়ার সক্ষমতা নেই। সেক্ষেত্রে সরকারের দায়বদ্ধতার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার তো টাকা নেয়নি। সরকার তো সেই লাভের অংশ নেয়নি। তবে দায় এড়াতে চাচ্ছি না। দায় নিয়েই আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে কী করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন কেনাকাটাই ভবিষ্যত। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর দিকে তাকালেই সেটি বোঝা যায়। ২০১৯ সালে আমেরিকায় অনলাইন কেনাকাটা যেখানে ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ, ২০২০ সাল শেষে সেটি দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। ২০১০ সালে আমেরিকায় অনলাইনে অ্যামাজনের খুচরা ব্যবসা ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। গত বছর মে মাসে সেটি দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশে। ব্রিটেনেও ৩৫ শতাংশ। চীনে খুচরা ব্যবসার পাঁচভাগের একভাগই হয় অনলাইনে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেসব দেশে অনলাইনে কেনাকাটার চল বেশি, সেসব দেশে ইন্টারনেটে খুচরা ব্যবসার মোট পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিদেশী ই-কমার্স জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি অশুভ লক্ষণ। দ্রুত গ্রাহকদের আস্থা অর্জন এবং সঙ্কটের সমাধান না করলে অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠান ফিরে যাবে।
