ঢাকা    ৭ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



বিলুপ্তপ্রায় হাজার বছরের পরম বন্ধু ছন ও মাটির ঘর

প্রকাশিত: ৩:৫১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩, ২০২১

বিলুপ্তপ্রায় হাজার বছরের পরম বন্ধু ছন ও মাটির ঘর

রাকিবুল ইসলাম রাফি- ছন আর মাটির ঘরে তুলনামূলক কম গরম অনুভূত হয়। একটা সময় ছিল গ্রামে ছন কিংবা মাটির ঘর দেখা যেত। গ্রামের এ বাড়ি ঐতিহ্যের প্রতীক ছিল। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বর্তমানে গ্রামে ছন আর মাটির ঘর দেখা যায় না। গ্রামে আর আগের মতো ছন চাষ করছেন না চাষিরা।

 

রোদে চিকচিক করা রূপালি ঢেউটিনের চালা বহুদূর থেকেই জানান দেয় তার সদম্ভ অস্তিত্বের কথা। সবুজের ফাঁকে সাদার ঝিকিমিকি। আর হাজার বছরের পরম বন্ধু অভিমানি ‘ছন/মাটি’ তাই নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে চলেছে। এমন চিত্র পশ্চিমের জেলা রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া সহ প্রায় প্রতিটি জেলাতেই দেখা গেছে।

 

দীর্ঘদিন ধরে ছনের চাষ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন কুষ্টিয়ার খোকশা উপজেলার মোতালেব বিশ্বাস। তিনি জানান, বাংলা বছরের আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ছন আহরণ করা হয়। চাষাবাদে তেমন পরিশ্রম নেই। শুধুমাত্র জমির যে অংশে ছন চাষ করা হবে তা পরিস্কার করে দিলেই কিছুদিন পর প্রাকৃতিকভাবেই ছনের কুঁড়ি জন্ম নেয়।

 

দেড় দুই হাত লম্বা হলে আগাছা পরিষ্কার করে একবার ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। আর ৬ থেকে ৭ ফুট লম্বা হলেই কাটার উপযুক্ত হয়। এরপর রোদে ২০ থেকে ২৫ দিন শুকিয়ে নিলেই ব্যবহার উপযোগী হয়। অন্যদিকে বাগানে বড় কোনো গাছ থাকলে তার ছায়া ও পাতা পড়ে ছনের বৃদ্ধিতে যেমনি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তেমনি ছনে পচন ধরে নষ্ট হয়। ফলে উৎপাদন হ্রাস পায়।

 

আশ্বিন মাসে ছন আহরণ করা হলেও বাজারে চাহিদা তেমন থাকে না। ফলে ভারপ্রতি মাত্র ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। বর্ষা মৌসুম আসার আগেই ছন ব্যবহারকারীরা তাদের পুরনো ঘরের চালা মেরামতের উদ্যোগ নেন। এ জন্য চৈত্র মাসে ভারপ্রতি বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ২৬০ টাকায়।

 

বিক্রেতাদের কথায়, নিজেদের বাগানে চাষাবাদ করলে দিনে একজন শ্রমিক ছয় বোঝা ছন কাটতে পারে। কিন্তু কাঁচা অবস্থায় দূর থেকে বহন করে আনা সম্ভব হয় না। আবার শুকোতেও সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ দিন। বাগান না থাকলে বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থান থেকে খুঁজে খুঁজে ছন আহরণ করতে হয়।

 

তারা জানান, আগের মতো চাহিদা না থাকায় দামও পাওয়া যায় না ভালো। ফলে এ কাজে শ্রম না দিয়ে বরং অন্য কাজে দিলে দিনে ৩০০ টাকা আয় করা যায়। তাই এই পেশার উপর নির্ভর করা যায় না। ফলে পেশা পরিবর্তন করা ছাড়া উপায় থাকছে না।

 

 

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কলিমহরের পান চাষি ছাত্তার জানান, অনেক চাষিরা ইতোমধ্যে ছনের বিকল্প ব্যবহার শুরু করেছেন। বিশেষত ধনিয়া পাতা চাষের জন্য ক্ষেতের চারপাশে বেড়া এবং উপরে রোদ প্রতিরোধক চালা তৈরি করছেন এই ছন ব্যবহার করে। তিনি নিজেও ২০ বরজে ছন ব্যবহার করছেন।

 

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ইদবার হোসেন, হরিপুর গ্রামের মনোয়ারা, আমিনুল, শহীদসহ আরও অনেকে জানান, ‘ছন ও মাটির’ তৈরি বাড়ি তারা পেয়েছেন অনেক আগে থেকেই। তাদের পূর্ব পুরুষেরাও এই ছন ও মাটির তৈরি বাড়িতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। তাই এখনো গ্রামের ২/১টি ঘর স্মৃতি হিসেবে দেখা যায়। তবে ছনের ছাউনিতে মাটির তৈরি বাড়ি বসবাসের জন্য অনেক আরামদায়ক হলেও কালের আর্বতে এবং আধুনিতকার ছোঁয়ায় অধিকাংশ মানুষ এ ঘর ভেঙে অধিক নিরাপত্তা ও স্বল্প জায়গায় দীর্ঘস্থায়ীভাবে অনেক লোকের নিবাস কল্পে গ্রামের মানুষরা ইটের বাড়ি-ঘর তৈরি করছেন বলে অনেকের ধারণা।

 

কিন্ত কালের বির্বতনে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে মাটির বাড়ি-ঘর। গত কয়েক বছর আগেও কুষ্টিয়া দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুরের প্রতিটি গ্রামে নজরে পড়তো ছন ও মাটির ঘরবাড়ি। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচার পাশাপাশি প্রচুর গরম ও শীতে বসবাসের উপযোগী ছন আর মাটির তৈরি এসব বাড়ি এখন আর তেমন চোখে পড়েনা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আর সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহি এসকল ঘর-বাড়ি বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে।

 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শারমিন আক্তার জানান, সমতলে ছনের উৎপাদন ও ব্যবহার কমে যাওয়ায় এখন বিলুপ্তির পথে। মূলত প্রতিবছর ছন কিনে চালা মেরামতে অর্থ ব্যয় না করে সবাই কমদামি ঢেউটিন ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আবার যাদের তেমন সামর্থ্য নেই তারা ছনের বিপরীতে পাটকাঠির ভরসা রাখছেন। তবে এক সময় হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত এই ছন হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। এর নানাবিধ ব্যবহার বাড়ানো গেলে হয়তো ছন রক্ষা করা সম্ভব হতো।