নজর২৪ ডেস্ক- ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন সংসদ সদস্য জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাঁকে দেখেই বিনিয়োগ করার ভরসা পেয়েছেন বলে জানান ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির অনেক গ্রাহক। কিন্তু এখন তিনি কোনো দায় নিতে চাচ্ছেন না।
ই-অরেঞ্জের প্রতারণার টাকা আদায়ে সোমবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মাশরাফি বিন মুর্তজার মিরপুরের বাসায় যান কয়েকজন নারী গ্রাহকেরা। তারা তাদের পাওনা অর্থ আদায়ে মাশরাফির সহযোগিতা চান। এ সময় জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ‘শেষ নিঃশ্বাস অবধি তাদের সঙ্গে আছেন’ বলে জানান।
মাশরাফির বাসা থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন ই-অরেঞ্জের বেশ কয়েকজন নারী গ্রাহক। এর মধ্যে মৌ আক্তার নামে একজন গ্রাহক জানান, তিনি ই-অরেঞ্জে ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। মৌ বলেন, ‘মাশরাফি ভাইকে আমরা বলেছি, তিনি ছিলেন বলেই আমরা টাকা দিছি। আপনি না থাকলে আমরা কখনোই ই-অরেঞ্জে যেতাম না। তখন তিনি বলেন, আপনারা জানের সদকা হিসেবে এই টাকা ছেড়ে দেন!’
মাশরাফি বিন মুর্তজার বাসায় যাওয়া আরেকজন নারী গ্রাহক উম্মে হানি। তিনি ই-অরেঞ্জে ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, সোমবার আমরা সাত-আটজন (নারী গ্রাহক) মাশরাফি ভাইয়ের বাসায় যাই। সেখানে টাকা আদায়ের বিষয়ে তার সঙ্গে দুই-তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়। আলোচনার একপর্যায়ে অনেকে কান্নাকাটি শুরু করে দেন।
তখন মাশরাফি ভাই আমাদের বলেন, ‘আমি এটার (ই-অরেঞ্জ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে) শেষ দেখে ছাড়ব। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। যদিও বিষয়টা এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে, তাই আমার বেশি কিছু করার নেই। তবে আমি আপনাদের সঙ্গে আছি।’
তখনও সবাই শান্ত না হলে মাশরাফি ভাই বলেন, ‘আপনারা এভাবে কান্নাকাটি করলে এবং ভেঙে পড়লে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তখন টাকার সঙ্গে সবই যাবে। এখনও টাকা পাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক কিছু হচ্ছে না। তবে, আপনারা ধৈর্য ধরেন, টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত মনে করেন জানের সদকা হিসেবে এ টাকা দিয়েছেন। আপনাদের টাকা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনাদের সঙ্গে আছি।’
‘জানের সদকা’ হিসেবে ই-অরেঞ্জে বিনিয়োগ করা টাকার আশা মাশরাফি ছেড়ে দিতে বলেছেন কি না— জানতে চাইলে উম্মে হানি বলেন, ‘না বিষয়টি তিনি এভাবে বলেননি। তিনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন যে টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা এটা ধরে নিই। তবে অনেক লোক ছিল সেখানে। কে কীভাবে বিষয়টি নিয়েছেন, আমি তা বলতে পারব না।’
মাশরাফির বাসায় যাওয়া আরও কয়েকজন গ্রাহক জানান, দুপুর ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত তাঁরা মাশরাফির বাসায় ছিলেন। এ সময় মাশরাফি তাঁদের কয়েক ধরনের কথা বলেন। প্রথমে মাশরাফি তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তবে তিনি এটাও জানিয়ে দেন যে, তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
একজন গ্রাহক বলেন, মাশরাফি আমাদের বলেছেন উনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন। কিন্তু তিনি এটাও বলেছেন, তাঁর করার তেমন কিছু নেই। তিনি আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যেতে বলেছেন।
এই গ্রাহকদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাশরাফি তাঁদের জানান, ই-অরেঞ্জের গ্রাহকদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে বলা হয়েছে, এখানে তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
গ্রাহকেরা জানান, মাশরাফি একপর্যায়ে রেগে যান এবং বলেন, আমার অ্যাড করার কথা আমি অ্যাড করেছি। আমি কি আপনাদের বলছি ই-অরেঞ্জে টাকা দিতে? কয়েকজন গ্রাহক তখন বলেন, আমরা আপনাকে দেখেই টাকা দিয়েছি। কারণ আপনি তো অভিনেতা নন, আপনি ক্যাপ্টেন, আপনি সাংসদ। সাকিব খান বা অন্য কাউকে দেখলে আমরা টাকা দিতাম না। আপনি জনগণের প্রতিনিধি বলেই আপনাকে দেখে আমরা ই-অরেঞ্জে আস্থা রেখেছি। এর উত্তরে মাশরাফি বলেন, আমার যতটুকু সম্ভব আপনাদের টাকা যেন ফিরে পান সেই চেষ্টা আমি করছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাশরাফি বিন মর্তুজা বলেন, ‘আমার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আমি তাঁদের সঙ্গে আছি। কিন্তু মাশরাফি থাকুক আর না থাকুক, প্রচলিত আইনের বাইরে তো মাশরাফি কিছু করতে পারবে না। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, মাশরাফি তো চাইলেও এটার দায় নিতে পারবে না। কারণ মাশরাফি এটার মালিক না। শেয়ার হোল্ডারও না। মাশরাফি এটার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। পৃথিবীর কোনো আইনে নাই যে একটা কোম্পানির কিছু হইছে সেখানে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর গিয়া ঠিক কইরা দিবে। আপনারা বলতে পারেন যে আমার জেনেবুঝে ওখানে যাওয়া উচিত ছিল কিনা।
এখন কথা হচ্ছে, তাদের তো ব্যবসা করার অনুমোদন মাশরাফি দেয়নি। একটা কোম্পানি যখন আপনি আমার কাছে আসবেন আমার জানার বিষয় হচ্ছে যে আপনার বাংলাদেশে ব্যবসা করার অনুমোদন আছে কিনা। একজন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে আমি সেটাই করেছি। একটা মুদি দোকানদারেরও ব্যবসা করতে ট্রেড লাইসেন্স লাগে। সেটা তো মাশরাফি দেয় না। তাদের ব্যবসায় মালিক তো আমি না যে তাদের পলিসি সম্পর্কে আমি জানবো।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গ্রাহক বলেন, সবার মতো মাশরাফিও আমাদের খেলার পুতুলের মতো খেলাচ্ছেন। মাশরাফি বলছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যেতে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গেলে বলা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে যেতে। আমরা জুন মাসে টাকা দিয়েছি। তখন মাশরাফি ই-অরেঞ্জের অ্যাম্বাসেডর ছিলেন। তিনি তো কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।
উম্মে হানি নামের ওই গ্রাহক বলেন, মাশরাফি আমাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আমরা কোনো কিছুতেই আসলে ভরসা করতে পারছি না।
উম্মে হানি আক্ষেপ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আমি আজ সর্বস্বান্ত। এ টাকা ফিরে না পেলে আমার আর বাঁচার উপায় নেই। দেশে কি দুর্নীতিবাজরা এভাবে পার পেয়ে যাবে? আমাদের টাকা কি আমরা ফিরে পাব না?’
আরেকজন গ্রাহক বলেন, আমরা যতটুকু বুঝলাম, মাশরাফি দায় এড়াতে চাইছেন। আমরা প্রত্যেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারের। আমরা তো কোটিপতি না যে, জানের সদকা হিসেবে সারা জীবনের জমানো সঞ্চয়টুকু দিয়ে দেব!
