দেশে-বিদেশে সোহেল রানার সম্পত্তির পাহাড়, বিস্মিত খোদ পুলিশের কর্মকর্তারাও

নজর২৪ ডেস্ক- দেশ-বিদেশে গাড়ি-বাড়ি-প্লট, আছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। এক দশকেই শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়া বনানী থানার বরখাস্ত পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানাকে নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়। খোদ পুলিশের কর্মকর্তারাও বিস্মিত তার এত সম্পদের কথা শুনে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন- কীভাবে এত অর্থবিত্তের মালিক হলেন তিনি? কথিত অনলাইন মার্কেট প্লেস ই-অরেঞ্জের মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার আগেই বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি।

 

দেশের বিভিন্ন স্থানেও তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এই পুলিশ কর্মকর্তা এখন পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ থানা পুলিশের হেফাজতে। পালিয়ে নেপাল যাওয়ার পথে চেংড়াবান্ধা সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেফতারের পর অনুপ্রবেশের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

 

ঢাকার পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, শেখ সোহেল রানা প্রায় একযুগ ধরে পুলিশের গুলশান ক্রাইম জোনে কর্মরত। একসময় তিনি ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি জোনেও কাজ করেছেন, ছিলেন গুলশান থানার অপারেশন অফিসারও। পাঁচ বছর আগে পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েক মাস অন্যত্র চাকরি করলেও ‘তদবির করে’ পোস্টিং নিয়েছেন বনানী থানায়।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গুলশান-বনানী এলাকায় কাজ করার কারণে তার সঙ্গে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের দূতাবাসের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে জনশক্তি রফতানিকারক কয়েকটি এজেন্সির সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তিনি। নির্দিষ্ট অংকের অর্থের বিনিময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসা পেতে সহায়তা করতেন।

 

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন দূতাবাসের সঙ্গে শেখ সোহেল রানার ভালো সম্পর্ক ছিল। এমনকি ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তার ভিসা পেতেও সহযোগিতা করেছেন তিনি। জনশক্তি রফতানিকারক সুনির্দিষ্ট কয়েকটি এজেন্সি শেখ সোহেল রানার মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করতো। প্রতিটি ভিসার জন্য শেখ সোহেল রানা ৮ হাজার ইউরো নিতেন। সোহেল রানার মাধ্যমে ভিসার আবেদন করলে নিশ্চয়তাও ছিল শতভাগ।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বলেন, প্রতিটি দূতাবাসে দিনে বা সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পাসপোর্ট জমা নেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে কোন প্রতিষ্ঠান কতটি পাসপোর্ট জমা দেবেন তার নির্দিষ্ট কোটাও রয়েছে। এর বাইরে দূতাবাসের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে বিশেষ কোটায় পাসপোর্ট জমা দেওয়া যায়। এই সুযোগটিই নিতেন সোহেল রানা। এভাবেই তিনি পাসপোর্ট প্রতি নির্দিষ্ট অংকের টাকা নিতেন।

 

একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, থাইল্যান্ডের পাতায়ায় হিলটন হোটেলের পাশে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। বাংলাদেশেও একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে বড় অংকের বিনিয়োগ রয়েছে তার। এই অংকও প্রায় একশ কোটি টাকার কাছাকাছি। এছাড়া পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সুপারশপ, বার ও রেস্টুরেন্টও রয়েছে সোহেল রানার।

 

তদন্ত রিপোর্ট থেকে আরও জানা যায়, পূর্বাচলে ৩ নম্বর সেক্টরে প্লট ও নিকেতনে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে সোহেল রানার। একটি ফ্ল্যাটে তার ছোট খালু মো. সাগর থাকেন, অন্যটি ভাড়া দেওয়া আছে। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা করে আসছেন তিনি। তার অফিস গুলশান-২ নম্বরে ডিসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারের পেছনে। এছাড়া গুলশানের শাহজাদপুরে আছে তার তিনটি ফ্ল্যাট। খাগড়াছড়িতে একটি রিসোর্টের জন্য জায়গা কেনা রয়েছে সোহেলের। গোপালগঞ্জে প্রায় ৫০০ বিঘারও বেশি জমির মালিক তিনি। এছাড়া তিনি বিপুল অংকের টাকার বিনিময়ে আমেরিকান, জার্মান ও কোরিয়ান ক্লাবের সদস্য হয়েছেন।

 

বিদেশে সম্পদের মধ্যে রয়েছে- থাইল্যান্ডের পাতায়ায় জমি, ফ্ল্যাট ও সুপারশপ। সেখানে হিলটন হোটেলের পাশে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে শতকোটি টাকার বিনিয়োগ, পর্তুগালে দোকান ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, প্যারিসে রেস্টুরেন্ট ও বার ব্যবসা, ফিলিপাইনের ম্যানিলায় স্ট্রিট বার এবং নেপালেও নানা ব্যবসায় তার বিনিয়োগ আছে। তার রয়েছে বিদেশি বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড।

 

গোয়েন্দা সংস্থাটি জানায়, পুলিশ কর্মকর্তা সোহেল এখন পর্যন্ত চারটি বিয়ে করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। প্রায় ১০ বছর হলো প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয় স্ত্রী একজন অভিনেত্রী। লন্ডনে উচ্চ শিক্ষা নিতে গিয়ে তিনি তৃতীয় বিয়ে করেন। আর চতুর্থ স্ত্রীর নাম নাজনীন নাহার বিথী। এই বিথীও অর্থ আত্মসাত মামলার একজন পলাতক আসামি। সোহেল সর্বশেষ শাহজাদপুরের সুবাস্ত নজরভ্যালির টাওয়ার-৩ এর ফ্ল্যাট ১০/বি-এ বসবাস করতেন।

 

তদন্তে এখন পর্যন্ত দুটি বেসরকারি ব্যাংকে ই-অরেঞ্জের অ্যাকাউন্ট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০ জুলাই পর্যন্ত একটি ব্যাংকের হিসাবে জমা পড়ে ৬২০ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ৭২৯ টাকা। বিপরীতে মোট ৬২০ কোটি ৪৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৯২ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ওই হিসাব নম্বরে এখন মাত্র ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৭ টাকা জমা আছে। আরেকটি ব্যাংক হিসাবে দেখা যায়, ৩০ জুন পর্যন্ত জমা পড়ে ৩৯১ কোটি ৬৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৯ টাকা। বিপরীতে তুলে নেওয়া হয়েছে বাকি ৩৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার ২৫৯ টাকা। আর জমা আছে দুই কোটি ৮৯ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৯ টাকা মাত্র।

 

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ই-অরেঞ্জের টাকা আত্মসাৎ ছাড়াও সোহেল রানা ক্ষমতা খাটিয়ে বনানী ও গুলশান এলাকার স্পা সেন্টার, বিউটি পার্লার, আবাসিক হোটেল ও বারগুলো থেকে বিপুল অংকের চাঁদাবাজি করতেন। এমনকি কাস্টমার ও ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করতেন তিনি। ভুক্তভোগীরা প্রাণের ভয়ে অভিযোগ করতেন না। এভাবে সোহেল রানা টাকার কুমিরে পরিণত হন। তার যাতায়াত ছিল উঁচু তলার মানুষের সঙ্গে। থানার তদন্ত কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও মামলার কোনো কাজে ঠিক সময়ে কখনোই পাওয়া যেত না তাকে। টেবিলে ফাইল রেখে এলে নিজের সময় মতো এসে সই করতেন।

 

আরও জানা গেছে, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে যারা গাড়ি কিনতেন, কোনোভাবে সেই লোনের কিস্তি দুই/চারটা বন্ধ হয়ে গেলে সেই গাড়ি তার লোকজন দিয়ে তুলে নিয়ে আসা হতো। এরপর ব্যাংকের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিতো। আবার কখনো গাড়িটিই বিক্রি করে দিতেন সোহেল। তার স্বর্ণ চোরাচালানের ব্যবসাও রয়েছে। দুবাই থেকে স্বর্ণ এনে যারা বিক্রি করেন দেশে তাদের সিন্ডিকেটকে বড়ধরনের সহযোগিতা করে টাকা হাতিয়ে নিতেন সোহেল রানা। স্বর্ণ মাফিয়াদের সঙ্গে তার খুব খাতির রয়েছে।

 

সোহেল রানার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সোহেল রানা এখন মামলার আসামি। ভারত ও বাংলাদেশে তার নামে মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদর দফতর চেষ্টা করে যাচ্ছে।’ সূত্র- বাংলা ট্রিবিউন ও সারাবাংলা।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *