পরীমণি ইস্যুতে শিল্পী সমিতির ভূমিকায় নানা প্রশ্ন, সমালোচনার ঝড়

বিনোদন ডেস্ক- ঢাকাই চলচিত্রের আলোচিত নায়িকা পরীমণি জীবনের কঠিনতম সময় পার করছেন। তিনি মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়ে কাশিমপুর কারাগারে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। তার এই দুঃসময়ে অনেকেই তার সমর্থনে কথা বলছেন। রাজপথে মানবন্ধন করে শোবিজ জগতের অনেকে পরীর মুক্তির দাবিও জানিয়েছেন। কিন্তু চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির কেউই তারপাশে নেই ।

 

পরীমণি একজন নায়িকা। সেই সুবাদে শিল্পী সমিতির সদস্যও ছিলেন। তবে গ্রেফতার হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় তার সদস্যপদ স্থগিত করে সমিতি। একটি সংবাদ সম্মেলন করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান সংগঠনটির নেতারা।

 

অবশ্য তখন তারা বলেছিলেন, সমিতির নিয়ম অনুযায়ী পরীমণির সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে। তবে তার প্রয়োজনে শিল্পী সমিতি পাশে থাকবে। আর্থিক কিংবা আইনী কোনো সহায়তা লাগলেও দেওয়া হবে।

 

কিন্তু সেই কথা রাখেনি শিল্পী সমিতি। পরীমনি আটক ও গ্রেফতারের ২০ দিন পার হলেও রাজপথ, আদালত বা জেলগেটে দেখা মেলেনি সমিতির কোনও নেতার। শুধু মুখে বললেও পরীমণির আদৌ কোনও সহযোগিতা দরকার কিনা- তা জানতে চায়নি সমিতির নেতৃস্থানীয় কেউই। এসব বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহল থেকে।

 

এদিকে পরীমণি ঘটনার পর তার বিষয়ে শিল্পী সমিতির ভূমিকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা পক্ষে-বিপক্ষে তাদের মতামত দিয়েছেন। তবে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নানা প্রশ্ন রেখেছেন চলচ্চিত্র শিল্পী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, করছেন সমালোচনাও।

 

তাদের প্রশ্ন আগে যারা অপরাধ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে যেখানে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, সেখানে পরীমণির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেল শিল্পী সমিতি? আবার অন্য শিল্পীদের বিপদে যেখানে শিল্পী সমিতি পাশে থেকেছে, সেখানে পরীমণির ক্ষেত্রে কেন নীরব?

 

তাদের প্রশ্ন চিত্রনায়ক, সংসদ সদস্য ফারুক, অভিনেতা ডিপজল, এ টি এম শামসুজ্জামানসহ অনেকের অসুস্থতায় সমিতির নেতাদের তৎপরতা ছিল প্রশংসনীয়। এমনকি সমিতির সদস্য না হলেও সঙ্গীতশিল্পী আকবরের অসুস্থতার সময় আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে বাসায় গেছেন জায়েদ খান।

 

কিন্তু পরীমণি আটকের পর পরীমণির পক্ষে আজো শিল্পী সমিতি কোনো ভূমিকা নেয়নি। এমনকি রাজধানীতে সাধারণ মানুষ ও বিশিষ্টজনেরা একাধিক মানববন্ধন করলেও সেখানেও সমিতির কারো উপস্থিতি চোখে পড়েনি।

 

পরীমণি নয়, শিল্পী সমিতিকে উল্টো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কেউ কেউ বলছেন, পরীমণির ক্ষেত্রে শিল্পী সমিতি যা করেছে তা সম্পূর্ণই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নয়তো শিল্পী সমিতির কমিটিতে থাকা ডিপজল-রুবেলের নামেও অভিযোগ, মামলা ছিল। অথচ তাদের বিরুদ্ধে যেখানে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি সেখানে পরীমণির পদ স্থগিত কতটুকু যুক্তিসঙ্গত।

 

এর আগে পরীমনি ইস্যুতে শিল্পী সমিতিকে ধুয়ে দেন ঢাকাই সিনেমার কিং খান খ্যাত অভিনেতা শাকিব খান। তিনি বলেছিলেন, ‘বিষয়টা এখন বিচারাধীন, ওই বিষয়ে কিছু বলছি না। তিনি যে মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন, তার কী অপরাধ সেটা বিশ্লেষণে যাচ্ছি না। দেশের প্রচলিত আইন-আদালতে যা আছে, নিশ্চয়ই নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে সঠিক বিচার হবে। শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে পরীমনিকে গ্রেপ্তারের পর তার প্রতি কোনো ধরণের সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে, দুঃসময়ে শিল্পীর পাশে না থেকে, উল্টো তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি।

 

কোনো কিছু না ভেবে পরীমনির সদস্যপদ সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। এটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো। সমিতির এই আচরণ ব্যক্তিগতভাবে আমাকে হতবাক ও বিস্মিত করেছে। আমি মনে করি, সহশিল্পীর সঙ্গে সংগঠনের এটি একটি অমানবিক আচরণ। প্রশ্ন থেকে যায়, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি তাহলে কাদের স্বার্থে?’ যোগ করেন শাকিব খান।

 

শাকিব খান বলেন, ‘যারা পরীমনিকে বিপথে নিয়ে গেছে, তাদেরকেও খুঁজে বের করা উচিত। ৩০টির বেশি সিনেমার সঙ্গে তিনি জড়িত বলে জানতে পেরেছি। তার হাতে আছে আরও বেশ কিছু সিনেমা। কিন্তু যারা বছরের পর বছর একটি সিনেমাতেও কাজ না করে দিনের পর দিন শিল্পী সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, তাদেরও আয়ের উৎস খুঁজে বের করা উচিত।’

 

বিষয়টি নিয়ে গতকাল যোগাযোগ করা হয় চলচ্চিত্র সংগঠনটির সভাপতি মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানের সঙ্গে। মিশাকে পাওয়া না গেলেও কথা বলেন জায়েদ।

 

গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমাদের সমিতির একজন আইনজীবী আছেন, তিনি সবসময় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন, খোঁজ রাখছেন। পরীর কী লাগবে- টাকা, আইনজীবী? সবই আমরা করবো তিনি যদি চান।’

 

পরীমণির প্রথম ছবি ‘ভালোবাসা সীমাহীন’র নায়ক ছিলেন জায়েদ। এমনকি এই অভিনেতার মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ ছবি ‘অন্তর জ্বালা’তেও নায়িকা হিসেবে পরীকে পেয়েছেন।

 

সহকর্মী হিসেবে হলেও তাকে দেখতে যাওয়া উচিত কিনা- এমন প্রশ্নে জায়েদ বলেন, ‘তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ নেই বলে পত্রিকায় দেখলাম। আইনজীবীকে দেখা করতে দেয়নি আদালত। এ কারণে আর যাইনি।’

 

জায়েদ খান জানান, আমান রেজা পরীর হয়ে আইনি লড়াই করছেন, এছাড়া দু’একজন সদস্য পরীর জন্য স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে সমিতি কখনোই কাউকে নিরুৎসাহিত করেনি। সহকর্মীর পাশে চাইলে যে-কেউই দাঁড়াতে পারেন।

 

যদিও এর আগে একাধিক সংবাদমাধ্যমকে জায়েদ খান বলেছেন, শিল্পী সমিতির সিদ্ধান্ত তিনি একা নেন না, মিশা সওদাগরও না। পরীমণির বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটা কমিটির ২১ জন সদস্যের।

 

তিনি বলেন, আগে যাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকার পরও ব্যবস্থা না নেয়ার মন্তব্য উঠছে তাদের বিষয়ে তখন সমিতিতে কেউ অভিযোগ করেননি। করলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হতো। জায়েদ খানের দাবি পরীমণির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, সোহেল রানাসহ সিনিয়র শিল্পীদের সাথে কথা বলেই।

 

তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উল্টো কথা। বরং সিনিয়রদের নাম ব্যবহার করে অসত্য তথ্য দিয়েছেন তিনি। সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে বেশিরভাগ জ্যেষ্ঠ শিল্পীর মতের প্রতিফলন হয়নি। এমনকি নায়ক আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগই করেনি সমিতির কেউ-ই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *