নজর২৪ ডেস্ক- আলোচিত নায়িকা পরীমনিকে তৃতীয় দফায় নেওয়া একদিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। শনিবার ঢাকা মহানগর হাকিম আশেক ইমাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে শনিবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে একটি মাইক্রোবাসে পরীমনিকে আদালতে হাজির করে হাজতখানায় রাখা হয়। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক কাজী গোলাম মোস্তফা পরীমনির জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। পরীমনি তার পক্ষে জামিন আবেদন না করায় গতকাল নিজের আইনজীবীদের ওপর অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে তিন দফায় হেফাজতে রেখে সিআইডির বিশেষ টিম পরীমনিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে বলে জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরীমনি সিআইডিকে নেপথ্য নায়কদের অনেকের নাম বলেছেন। নজরুল রাজ ছাড়াও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কতজন তাকে ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণের নামে অর্থ নিয়েছেন তাদের কয়েকজনের নাম বলেছেন। কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সখ্যতার বিষয়েও তথ্য দেন পরীমনি। জমির দালালি করে যারা কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছেন এমন ব্যবসায়ীদের বিষয়েও তথ্য দেন তিনি।
সিআইডি বলছে, পরীমনির দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে পরীমনির বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা তার আবেদনে উল্লেখ করেন জিজ্ঞাসাবাদে এই নায়িকা ঘটনার নেপথ্যের মূল হোতাদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে হোতাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এমন তথ্য জানানো হয়নি। ইতোমধ্যে পরীমনিকে বারবার রিমান্ডে নেওয়ার বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনেন একজন আইনজীবী।
শনিবার সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দেওয়া আবেদনে বলেন, আসামি পরীমনি মামলার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। তার দেওয়া প্রদত্ত তথ্য-উপাত্ত তদন্তের স্বার্থে যাচাই করে বাছাই হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মামলার তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা প্রয়োজন। তাকে জামিন দিলে মুক্তি পেলে তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
এদিন আসামি পক্ষে কোনো জামিনের আবেদন ছিল না। তবে পরীমনিকে যেন আদালতে তোলা হয় এবং তার উপস্থিতিতে শুনানি করা হয়, সেই আবেদন করেন তার আইনজীবীরা। আইনজীবীদের আবেদন অনুযায়ী বেলা পৌনে ৩টার দিকে পরীমনিকে আদালতের এজলাসে ওঠানো হয়।
শুনানিতে আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভি, কামরুজ্জামান চৌধুরী ও মজিবুর রহমান বলেন, পরীমনি অসুস্থ। তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়না। কোনো আইনজীবীর সঙ্গে তার কথা বলতে দেওয়া হয় না। আমরা মামলা বিষয়ে আসামির সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। আসামি বাংলাদেশের একজন স্থায়ী নাগরিক, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আইন তাকে দিয়েছে। আইনজীবীরা আদালতে আসামিদের সঙ্গে দেখা ও কথা বলতে পারেন। আসামির কাছে জানতে হবে কী ঘটনা ঘটেছিল। আইনের বিষয়ে আমরা কথা বলতে চাই।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু বলেন, আসামির সঙ্গে দেখা ও কথা বলতে দেওয়ার বিষয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। যখন আসামি জামিনে বের হবেন তখন তারা কথা বলবেন। এর আগে পরীমনির সঙ্গে তার নানার কথা বলতে দেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে।
এ সময় বিচারক আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা কি কথা বলতে চান? আইনজীবীরা বলেন, আমরা আইনগত বিষয়ে কথা বলতে চাই। প্রয়োজনে আপনি সিএমএম হাজতখানায় কথা বলার সুযোগ করে দেন। ওখানে তো নিরাপদ জায়গা। এরপর বিচারক পরীমনিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়ে দেখা করার বিষয়ে নথি পর্যালোচনা করে পরে আদেশ দেবেন বলে জানিয়ে এজলাস থেকে নেমে যান। পরে আর আদালত আইনজীবীদের দেখা ও কথা বলার আবেদন মঞ্জুর করেননি।
বিচারক এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার পর পরীমনি তার আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভি, কামরুজ্জামান চৌধুরী ও মজিবুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা আমার জামিন চান না কেন? আমি তো পাগল হয়ে যাচ্ছি। আপনারা জামিন চান, আপনারা আমার সঙ্গে কী কথা বলবেন? আমি তো পাগল হয়ে যাব? আপনারা বুঝতেছেন, আমার কী কষ্ট হচ্ছে? আপনাদের নিজেদের মধ্যে কী হয়েছে, কেন জামিন চাচ্ছেন না?
এরপর একটি প্রিজন ভ্যানে করে বেলা সোয়া ৩টার দিকে পরীমনিকে আদালতের হাজতখানা থেকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
গত ১৯ আগস্ট পরীমণির একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম। এর আগে গত ১৩ আগস্ট পরীমণি ও তার সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপুকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। ওই দিন সন্ধ্যা ৭টায় তাকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। কারা সূত্র জানায়, নায়িকা পরীমণিকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে (রজনীগন্ধা ভবন) রাখা হয়।
তার আগে ১০ আগস্ট পরীমণি ও আশরাফুল ইসলাম দীপুর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস। গত ৫ আগস্ট পরীমণি ও দীপুর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশিদ।
গত ৪ আগস্ট রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে পরীমণি ও তার সহযোগী দীপুকে আটক করে র্যাব। এ সময় পরীমণির বাসা থেকে বিভিন্ন মাদক জব্দ করা হয়। ৫ আগস্ট র্যাব-১ বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য আইনে পরীমণি ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করে।
