নজর২৪ ডেস্ক- হঠাৎ একদিন বন্ধুদের সঙ্গে নিখোঁজ হয়ে যান সিলেট নগরীর বাসিন্দা ২০ বছর বয়েসি আব্দুর রাজ্জাক।
পরে খোঁজ নিয়ে পুলিশ জানায়, ‘জেহাদ’ করতে রাজ্জাক আফগানিস্তানে চলে গেছেন। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তার আত্মীয়-স্বজন। পুলিশ নিশ্চিত করে জানায়, আব্দুর রাজ্জাক এখন আফগানিস্তানে অবস্থান করছেন।
পুলিশের বক্তব্য, কথিত ‘হিজরত’ আর ‘মুসলমানদের রক্ষার’ নামে আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িছাড়া। বড় ভাই সালমান খান তার নিখোঁজের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আফগানিস্তানে যাওয়া বাংলাদেশি যুবকের মধ্যে অন্তত তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত হতে পেরেছে পুলিশের জঙ্গিবিরোধী বিশেষ শাখা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ (সিটিটিসি)।
এই তিনজনের একজন আব্দুর রাজ্জাক। অন্য দুইজনের নাম এখনই প্রকাশ করতে চায় না তারা। এই তিনজন ভারত ও পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত তথ্য মিলেছে।
তবে এই সংখ্যাটি তিন নয়, এটাও নিশ্চিত। কারণ, আফগানিস্তান যাওয়ার পথে বেশ কিছু যুবক ভারতে আটক হয়েছেন।
আরও কয়েকটি গ্রুপ আফগানিস্তান যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে গত তিন সপ্তাহের অভিযানে বাংলাদেশেই গ্রেপ্তার করেছে সিটিটিসি ও পুলিশের অন্যান্য সংস্থা।
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘তিনজনের নাম পেয়েছি। তাদের একজন রাজ্জাক।’
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, প্রথমে তারা ভারতে প্রবেশ করছেন। সেখান থেকে একটি গ্রুপ তাদের পাকিস্তানে পার করে দিচ্ছে। পাকিস্তান থেকে আরেকটি গ্রুপ তাদের আফগানিস্তানে তালেবানদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
রাজ্জাক যেভাবে আফগানিস্তানে
সিলেট নগরের লামাবাজার এলাকায় ভাইয়ের বাসায় থাকতেন ২০ বছর বয়সী আব্দুর রাজ্জাক। ওই এলাকারই মদন মোহন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তেন। স্বভাবে নম্র-ভদ্র, ধর্মপরায়ণ ছিলেন। কারও সঙ্গেই কোনো বিরোধ নেই। সেই রাজ্জাক হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান গত ২৫ মার্চ।
‘বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছি, দুদিন পর ফিরে আসব’- ভাইকে এমনটি বলে সেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন রাজ্জাক। এরপর আর ফেরেননি। গত ১ এপ্রিল সিলেট কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়রি করেন রাজ্জাকের বড় ভাই সালমান খান।
রাজ্জাকদের মূল বাড়ি কুমিল্লার বঙ্গুরা থানায়। তবে ছোটবেলা থেকেই সিলেটে ভাইয়ের বাসায় থেকে পড়ালেখা করতেন তিনি। নগরের দ্য এইডেড হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেছেন।
সালমান খান বলেন, ‘সাম্প্রতিক লকডাউনে চাকরি হারিয়েছি। তাই মাস দুয়েক আগে সিলেট থেকে পরিবার নিয়ে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে চলে আসছি।’
ভাই কোথায় আছে জানেন না জানিয়ে সালমান বলেন, ‘পুলিশও কোনো খোঁজ দিতে পারছে না। তবে শনিবার থেকে কয়েকজন সাংবাদিক ফোন দিয়ে তার তথ্য নিয়েছে।’
তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তার (রাজ্জাকের) কোনো সমস্যা হয়েছে কি? তাকে কীভাবে পাব? এক পুলিশ বলেছে, সে দেশ ছেড়ে চলে গেছে।’
সালমানের ভাষ্যমতে, ছোটবেলা থেকেই নামাজ পড়তেন রাজ্জাক। বন্ধুদের সঙ্গে তাবলিগে যেতেন। পরিবারের অন্যদেরও নামাজ পড়তে বলতেন। ইসলামি রীতি অনুসারে জীবন যাপন করতে বলতেন।
তিনি বলেন, ‘রাজ্জাকের বন্ধুরাও খুব ভালো। তাদের সকলকেই আমরা চিনি। একটাও খারাপ ছেলে নেই। এলাকার সকলে রাজ্জাককে ভালো ছেলে হিসেবেই চেনে।’
ভাই নিখোঁজ হওয়া প্রসঙ্গে সালমান বলেন, ‘২৫ মার্চ সে আমাকে জানায় তার এক বন্ধুর বাড়িতে যাবে। দুদিন পর ফিরে আসবে।’
সেই বন্ধু কে-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বন্ধুর বাড়ি সিলেটের লামাবাজারে। একটা মাদ্রাসায় পড়ে। নামটা এখন ভুলে গেছি। কিন্তু দুই দিন পেরিয়ে গেলেও সে ফিরে আসেনি। ওই বন্ধুর বাসায়ও সে নেই। এমনকি ওই বন্ধুও নিখোঁজ রয়েছে। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ১ এপ্রিল থানায় জিডি করি। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেই।’
-কোনো সন্দেহ করেননি?
সালমান বলেন, ‘রাজ্জাক মাঝে মাঝেই বন্ধুদের বাড়ি যেত। থাকতও অনেক সময়। এরপর আবার ফিরে আসত। তবে এবার আসেনি। তার সেই বন্ধুটিরও খোঁজ মিলছে না।’
রাজ্জাকের নিখোঁজের ব্যাপারে থানার ভাইয়ের করা সাধারণ ডায়রি তদন্ত করছেন নগরের লামাবাজার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল আমিন।
তিনি বলেন, ‘রাজ্জাকের মোবাইল নম্বর ট্রেস করে আমরা তার সর্বশেষ অবস্থান দেখতে পেয়েছি নগরের কোতোয়ালি ও জালালাবাদ থানার মধ্যবর্তী খালপাড় নামক একটা স্থানে। ওই জায়গায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর আর তাকে ট্রেস করা যাচ্ছে না। এখন বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পাচ্ছি, সে তালেবানের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে আফগানিস্তান চলে গেছে।
রাজ্জাক যে বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, তার বাড়ি লামাবাজারে বলে রাজ্জাকের ভাই সালমান জানিয়েছিলেন।
তবে এসআই আল আমিন বলেন, ‘ওই ছেলের বাড়ি মৌলভীবাজারে। তার নাম ফরিদ উদ্দিন। তাকে কিছুদিন আগে ঢাকার একটি মামলায় পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তিনি এখন কাশিমপুর কারাগারে আছে।’
এসআই আল আমিনের ধারণা, ফরিদ উদ্দিনের দেওয়া তথ্য থেকেই রাজ্জাকের আফগানিস্তান যাওয়ার তথ্য জেনে থাকতে পারে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কোনো দল।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘একটি ছেলে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগে বেশ আগে একটা জিডি হয়েছিল। তবে তার সন্ধান আমরা পাইনি। সে কোথায় আছে তাও বলতে পারব না।’
