নজর২৪ ডেস্ক- করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৪ দিনের কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। ২৩ জুলাই থেকে অব্যাহত থাকা এই কঠোর লকডাউন প্রতিপালনে একদিকে জাতীয় কমিটি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সরকারের ওপর চাপ আছে।
তাদের পরামর্শ, ১৪ দিনের এই কঠোর লকডাউন বাস্তবায়ন করা গেলে বিপুল স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা যাবে। না হয় হাসপাতালগুলোর পক্ষে করোনা আক্রান্ত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বিপরীতে ব্যবসায়ীরা দাবি জানাচ্ছেন কঠোর লকডাউনের মধ্যেই কলকারখানা খুলে দেওয়ার। পাশাপাশি ক্ষতি কাটাতে ব্যবসায়ীরা নতুন করে প্রণোদনার দাবিও জানাচ্ছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার পড়েছে উভয় সংকটে। এমন অবস্থার মধ্যে আজ মঙ্গলবার দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠক বসার কথা রয়েছে।
করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে লকডাউন বা কঠোর বিধি-নিষেধ একমাত্র সমাধান নয়। আবার লকডাউন না দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও কঠিন। এমন সংকটের মধ্যেই সরকার বিভিন্ন সময়ে বিধি-নিষেধের মাত্রায় হেরফের করছে।
এর আগে একাধিক লকডাউনে শিল্প-কলকারখানা খোলা ছিল। চলমান লকডাউনের আগে এক সপ্তাহ স্বাভাবিক চলাফেরা করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হবে জেনেও দেশের অর্থনীতি এবং নাগরিকদের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে ঈদ-পরবর্তী ১৪ দিনের কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিন্তু ঈদের আগে থেকেই বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা টানা ১৪ দিন কঠোর লকডাউন না দিতে অনুরোধ করে আসছেন। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চেষ্টাও করেছেন তাঁরা। তবে সরকার অনড় অবস্থানে থেকে লকডাউন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে এখনো অটল।
এদিকে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও লকডাউন মানা নিয়ে বিপুল অনীহা রয়েছে। লকডাউনের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের যে প্রত্যাশা করছে সরকার, তা কতটা অর্জিত হবে বলা কষ্ট। দেশের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে খবর নিয়ে জানা গেছে, বড় শহরগুলোয় গণপরিবহন, মার্কেটসহ প্রায় সব কিছুই বন্ধ রয়েছে। তবে ছোট ছোট শহর ও বাজারে লকডাউনের প্রভাব তেমন নেই। গ্রামে-গঞ্জে, ঘরে ঘরে সর্দিজ্বরের প্রকোপ থাকলেও মানুষ এখনো মাস্ক পরা নিয়ে উদাসীন। এসব বিষয়ও সরকারের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গার্মেন্টস শিল্পমালিকদের বেশির ভাগ আগামী ১ আগস্ট থেকে কর্মীদের কাজে যোগদানের বার্তা দিয়ে ঈদের ছুটি দিয়েছেন। অনেক কারখানার গেটেও এই বার্তা টানানো হয়েছে। এসব তথ্য সরকারের দায়িত্বশীলরা জানেন। সরকারের ওপর এটি ব্যবসায়ীদের পরোক্ষ চাপ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সরকারের দায়িত্বশীলরা ব্যবসায়ীদের এমন আচরণকে দায়িত্বহীনতার সঙ্গে তুলনা করছেন। একই সঙ্গে গার্মেন্টসহ অন্যান্য কলকারখানার শ্রমিকদের লকডাউনের বিরুদ্ধে মাঠে নামানোর ছকও করা হচ্ছে। সরকারের একাধিক সংস্থা এসব তথ্য জানতে পেরেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে সরকার কঠোর বার্তা পাঠিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার ইচ্ছা করে লকডাউন দেয়নি। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ যাতে সরকারের সক্ষমতার বাইরে চলে না যায়, সে জন্যই এটি করা। পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করলে শিল্প-কলকারখানা খুলে দেবে সরকার।
এদিকে লকডাউন অব্যাহত রাখা হলে ব্যাপক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে সরকারের কাছে নতুন করে প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি চাইছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।
বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘লকডাউন শিথিল করার কোনো ইশারা আমরা এখনো পাইনি। আমদানি-রপ্তানি অব্যাহত রাখলেও কারখানা বা অফিসে গিয়ে কর্মকর্তারা কাগজপত্র তৈরি করে বন্দরে পাঠাতে পারছেন না। ফলে বন্দরে কনটেইনার জট লেগে গেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বাড়তি জরিমানার হুমকি দিচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘টানা এত দিন কলকারখানা বন্ধ রাখায় ঈদের আগেই আমরা সরকারকে লিখিতভাবে প্রণোদনা দেওয়ার কথা জানিয়েছি। ৫ আগস্টের পর চালু হলে কলকারখানা খুলতে আরো দু-তিন দিন লাগবে। বেতন দেওয়ার সময়ও হবে তখন। দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে আমরা শ্রমিকদের বেতন দেব কোথা থেকে?’
করোনাসংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ শহিদুল্লা বলেন, ‘আমাদের কথা পরিষ্কার। সব সময় লকডাউন দেওয়া কোনো সমাধান নয়। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন প্রয়োজন তখন লকডাউন না দিয়ে উপায় নেই। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির সম্মুখীন আমরা। তাই চলমান লকডাউন ৫ আগস্ট পর্যন্ত চালাতেই হবে।’
