ইভ্যালিকে যেন ডেসটিনির ভাগ্যবরণ করতে না হয়: অতিরিক্ত সচিব মিলন

নজর২৪ ডেস্ক- অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (ই-কমার্স) ইভ্যালির চলতি দায় ও লোকসান দুটিই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সম্প্রতি ইভ্যালি.কম.বিডি-এর ওপর পরিচালিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৭ জুন (বৃহস্পতিবার) প্রতিবেদনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে ইভ্যালিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা বলছেন অনেকে। ইভ্যালিকে নিয়ে নেতিবাচক ও ইতিবাচক দুই ধরণের মন্তব্যই করছে দুই শ্রেণির মানুষ। কেউ কেউ আবার ইভ্যালির ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

 

এসবের মধ্যেই ইভ্যালির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন আলোচিত অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব কবীর মিলন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন-

 

“আমরা কেউই চাই না, আমাদের দেশের কোনো কম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হোক। জিডিপিতে তার অবদান ছোট হয়ে যাক। তার প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাক। যদিও এটা স্বীকার করে নিতেই হবে যে, আমরা এক আস্থাহীন সময় পার করছি। খাদ্য শিল্পের কথাই যদি ধরি, কম্পানি যতই ভাল হোক বা প্রোডাক্ট যতই ভাল কিংবা অন্তত ক্ষতিকর না হলেও আমাদের কাছে তা ভয়াবহ এক আতংকের নাম। যদিও জনগণকে তার জন্য দোষ দেয়া যায় না। কিন্তু সত্য না হলেও শুধু ভুল বা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে দিন শেষে ক্ষতি হবে জাতির।

 

দেশের একটি খাদ্য প্রস্তুতকারক কম্পানি স্ট্রবেরী, অরেঞ্জ জ্যাম বানাচ্ছে। নিশ্চিত বলতে পারি দামে ও মানে বিদেশি যে কোনো দেশের জ্যামের চেয়ে অনেক ভাল। দুইশত টাকায় ৪৫০ গ্রাম বোতল ভরা স্ট্রবেরী পাল্প। নি:সন্দেহে অত্যন্ত ভাল মানের। একট কোম্পানি মেয়োনিজ (Mayonnaise) বানাচ্ছে। খেয়ে বলতে বাধ্য হবেন, তা বিদেশে ব্র‍্যান্ডের চেয়ে দামে মানে অনেক ভাল।

 

৮০-৯০% কনসেন্ট্রেটেড সুইটেন্ড জুস বানাচ্ছে একটি দেশিয় প্রতিষ্ঠান। বিদেশি আমদানি করা উচ্চমূল্যের অরেঞ্জ জুসের চেয়ে দুইশত টাকা লিটারের আমাদের জুস কোনো অংশেই খারাপ বা নিন্মমানের নয়। কিন্তু আফসোসের বিষয়, আমরা নিশ্চিত ধরে নিয়েছি, জুস বা ড্রিংস মানেই মিস্টি কুমড়া আছে তার মধ্যে। এ ধরণের ভ্রান্ত ধারণা আমাদের শিল্পায়নকে মারাত্মকভাবে ব্যহত করবে।

 

আমরা ক’জনে জানি এমন উন্নতমানের প্রডাক্ট দেশে তৈরি হচ্ছে। ক’জনে বিশ্বাস করবেন তা! স্যাকারিন, এসেন্স, কালার আর জিলাটিনের যুগ থেকে বের হয়ে আসছি আমরা ধিরে ধিরে। নানান সমস্যার মাঝেও কিন্তু সুস্পষ্ট আলোর রেখা দৃশ্যমান। আমি আমদানি করা জুস, জ্যাম এবং মেয়োনিজ কেনা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি।

 

অন্যসব প্রতিষ্ঠানের মত ইভ্যালি ডুবে যাক সব বিনিয়োগকারী নিয়ে, তা আমরা কখনোই চাইব না। প্রতিষ্ঠান দাঁড়াক, এমপ্লয়মেন্ট সুযোগ সৃষ্টি হোক, বিনিয়োগ বাড়ুক, কম দামে ভাল পণ্যের সুবিধা পাক জনগণ। কিন্তু তারা যেভাবে আগ্রাসী বিনিয়োগ টানছে, তাতে বিপদ না হলেই হলো।

 

আজ বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের উপর করা এক প্রতিবেদনে বলেছে, গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছে ইভ্যালীর দেনার পরিমাণ ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যেখানে কম্পানিটির চলতি সম্পদ মাত্র ৬৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এই বিশাল গ্যাপ কিভাবে দূর করবে ইভ্যালি, তা দেখার বিষয়। কাঁঠালের আঠার মত যদি তা জড়িয়ে যেতেই থাকে, তবে আসলেই এক মহাবিপদ।

 

নির্দিষ্ট ডেলিভারি সময়ের বাইরে গ্রাহকের বিনিয়োগ করা টাকা যে মাসের পর মাস পড়ে থাকে, তা যদি হয় ইভ্যালির একটি আয়ের সোর্স, তবে তা কতটুকু এ্যাথিক্যাল সে বিষয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকেই যায়।

 

সেলেব্রিটিতে ভরপুর ইভ্যালি কখনোই ডুবে না যাক সে প্রার্থনা করছি এবং তাদের সহ এরকম লগ্নিকারী সব প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতে রাখার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নেয়ার অনুরোধ করছি। আমরা পিছনে ফিরে যেতে চাই না। আগে থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যাতে ডেসটিনির ভাগ্যবরণ করতে না হয় কাউকে। আমাদের দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আকাশের তারা হয়ে জ্বলুক, সেই কামনাই করছি।”

 

 

উল্লেখ্য, সম্প্রতি নজরদারির বাইরে থাকা ই-কমার্স সাইটগুলোয় উচ্চ মাত্রায় আর্থিক লেনদেনের ঝুঁকির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি রিপোর্ট পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম অর্থের তুলনায় এসব প্লাটফর্মের দৃশ্যমান তেমন কোনো সম্পদ না থাকার বিষয়টিই সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল।

 

রিপোর্টে বলা হয়, অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (ই-কমার্স) ইভ্যালির চলতি সম্পদের পরিমাণ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সম্পদের চেয়ে ৬ গুণের বেশি এই দেনা পরিশোধ করার সক্ষমতা কোম্পানিটির নেই।

 

এছাড়া কোম্পানিটি চলতি দায় ও লোকসানের দুষ্ট চক্রে বাঁধা পড়েছে’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘ক্রমাগতভাবে সৃষ্ট দায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব টিকে না থাকার ঝূঁকি তৈরি হচ্ছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *