শত শত গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা: স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বোনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট

নজর২৪ ডেস্ক- শত শত গ্রাহকের বিমা দাবির টাকা পরিশোধ করছে না সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। টাকা পেতে আদালতে মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান (স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বোন) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত নয়টি মামলায় ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে।

 

অভিযোগ উঠেছে, বিমা কোম্পানিটির মালিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। অন্যদিকে, বছরের পর বছর ধরনা দিয়েও গ্রাহকরা বিমার সমুদয় টাকা আদায় করতে পারছেন না। উল্টো গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।

 

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ১০ বছর মেয়াদি জীবন বিমা পলিসি করেছেন এমন একজন হলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মনিরুজ্জামান ডাবলু। মেয়াদপূর্তির পর এক টাকাও পাননি তিনি। আদালত ও বিমা কোম্পানিতে ঘুরতে ঘুরতে চার বছর পার হয়েছে।

 

তার মতো আরেক ভুক্তভোগী দৌলতপুর উপজেলারই মুক্তার হোসেন। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১০ বছর মেয়াদি জীবন বিমা পলিসি করেছিলাম। মেয়াদপূর্তির পর তারা টাকা দিচ্ছে না। কথা ছিল মেয়াদপূর্তি হলে একবারে ডাবল (দ্বিগুণ) টাকা দেবে। কিন্তু এখনও কোনো টাকা দেয়নি, উল্টো হয়রানি করছে। তাদের কাছে ঘুরতে ঘুরতে যখন কোনো কাজ হলো না তখন আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি।’

 

অপর এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করে বলেন, পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় সাত বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু এখনো এক টাকাও পাইনি। ডাবল টাকা তো দূরের কথা, আসল টাকাই ফিরে পাচ্ছি না।

 

‘বাংলাদেশের অনেক বিমা কোম্পানি ভুয়া। ভেবেছিলাম স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স নিরাপদ। কারণ, তিনি সরকারের মন্ত্রী। এজন্য কোম্পানির অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে বিমা করেছিলাম। কোম্পানির কর্মীরাও আমাদের বুঝিয়েছিল যে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এখানে কোনো সমস্যা হবে না। পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হলেই পাওয়া যাবে ডাবল টাকা। কিন্তু মেয়াদ শেষ হলে এখন টাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। অনেক সময় হুমকির সম্মুখীনও হতে হচ্ছে’— অভিযোগ ওই ভুক্তভোগীর।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন অনেক ভুক্তভোগী বলেন, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা কিছু চাই না। নিয়ম অনুযায়ী পাওনা টাকা দিলেই আমরা খুশি। ক্ষমতাবান বলেই আজ আমাদের কোনো মূল্য দিচ্ছে না। সরকারের কাছে আমরা এর বিচার চাই।

 

এ নিয়ে কুষ্টিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (দৌলতপুর) আদালতে দৌলতপুর উপজেলার খলিসাকুন্ডি ইউনিয়নের হাকিম জোয়ার্দ্দারের ছেলে বশির আহমেদ, একই ইউনিয়নের মো. শামসুর রহমানের ছেলে হাবিবুর রহমান ও মনিরুজ্জামান ডাবলু বাদী হয়ে পৃথক মামলা দায়ের করেন।

 

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের মালিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, তার স্ত্রী ও ছেলে। মালিকানা আছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মা, বোন, ভগ্নীপতি ও ভাগ্নে’র। গ্রাহক প্রতারণায় কোম্পানির চেয়ারম্যান ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বোন অধ্যাপক রুবিনা হামিদসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেন কুষ্টিয়ার আদালত।

 

এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুল মতিন খন্দকার বলেন, গ্রাহক প্রতারণায় কোম্পানির চেয়ারম্যান ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বোন অধ্যাপক রুবিনা হামিদসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট (পরোয়ানা) জারি করেন কুষ্টিয়ার আদালত। এখন পর্যন্ত আমার কাছে এ সংক্রান্ত মোট ১১টি মামলা আছে। মোট গ্রাহক ৪৯৭ জন। মোট অর্থের পরিমাণ ৯০ লাখ ৬২ হাজার ৯২৬ টাকা। নয় মামলাতে ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। দুটি মামলা লকডাউনের জন্য স্থগিত আছে। এর মধ্যে ছয়টি মামলার ওয়ারেন্ট চলে গেছে।

 

‘ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের অফিস রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত। কুষ্টিয়া থেকে বনানী থানায় ওয়ারেন্ট গেলেও একটিরও তামিল হয়নি’— যোগ করেন তিনি।

 

এ বিষয়ে ক্যামেরায় কথা বলতে রাজি হয়নি বনানী থানা পুলিশ।

 

এছাড়াও সারা দেশে সানলাইফের কাছে ৩০ কোটি টাকার বেশি পাওনা গ্রাহকদের। কুষ্টিয়া ছাড়াও নড়াইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আরও কয়েকটি জেলায় গ্রাহকরা মামলা করেছেন ইন্স্যুরেন্সটির বিরুদ্ধে। সেসব মামলার কয়েকটিতেও ওয়ারেন্ট জারি হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *