আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে হেফাজতে ইসলাম, বড় করছে আহ্বায়ক কমিটি

নজর২৪ ডেস্ক- সরকারকে চাপে ফেলতে গিয়ে উল্টো বিপাকে পড়েছে হেফাজতে ইসলাম। বাধ্য হয়েছে বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করতে। কাগজে-কলমে হেফাজত অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হলেও সংগঠনটির জন্ম থেকে অদ্যাবধি তাদের কর্মকাণ্ড ধর্মীয় চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

 

একপর্যায়ে সারাদেশে টানা গ্রেপ্তার অভিযানসহ নানামুখী চাপে থাকা হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় গত মাসে। এর পর পরই বিলুপ্ত কমিটির আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়।

 

এই আহ্বায়ক কমিটির আকার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি। পাঁচ থেকে সাতজন নেতা যুক্ত করে কমিটি ১০-১২ সদস্যের করা হবে। বর্ধিত এই কমিটিতে শফিপন্থিদের ঠাঁই হচ্ছে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়।

 

এদিকে ২০১৩ সালের ৫ মের সমাবেশ কেন্দ্র করে দোকানপাট, সরকারি স্থাপনা, পুলিশ ফাঁড়ি, থানা ও গাড়িতে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় ৮৩ মামলা হয়। এ ছাড়া গত ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর কেন্দ্র করে চালানো তা-বে ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত ১৫৪টি মামলা হয়েছে।

 

এর বাইরে ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় ১২ মামলা হয়। সব মিলিয়ে ২৪৯টি মামলায় অজ্ঞাতনামা প্রায় পৌনে দুই লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় হেফাজতের শীর্ষস্থানীয় ৩০ নেতাসহ সারাদেশে এক হাজার ২৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

নরেন্দ্র মোদির সফরবিরোধী সহিংসতার পর হেফাজতকে ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা আসে সরকারের শীর্ষমহল থেকে। এর পরই ধরপাকড় শুরু হয়। এর মধ্যে ২৫ এপ্রিল হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। এ কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হন আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, আহ্বায়ক জুনায়েদ বাবুনগরী ও সদস্য সচিব নুরুল ইসলাম জিহাদী, সদস্য আল্লামা সালাউদ্দিন নানুপুরী ও অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী।

 

তারা সবাই জুনায়েদ বাবুনগরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। পাঁচজনের কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের পদে নেই। বর্ধিত কমিটিতে নতুন যুক্ত হতে যাওয়া নেতারাও হবেন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। কমিটি নিয়ে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যোগাযোগ রাখছে। তবে কবে নাগাদ এই বর্ধিত কমিটি ঘোষণা হবে তা নিশ্চিত করে বলেনি সংশ্লিষ্ট সূত্র।

 

এ বিষয়ে জুনায়েদ বাবুনগরীর ঘনিষ্ঠ বিলুপ্ত কমিটির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস বলেন, বর্তমানে মাদ্রাসা বন্ধ রয়েছে। মাদ্রাসা খোলার পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

হেফাজতে ইসলামের সদ্য বিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের ওপর উপর থেকে চাপ আছে যে রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কাউকে হেফাজতের কমিটিতে না রাখার জন্য। এবার অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি করব।

 

বিলুপ্ত ও আহ্বায়ক কমিটির মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদীর কাছ থেকে অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোন করলে তিনি লাইন কেটে দেন।

 

আগের সংবাদ আরও পড়ুন-

 

শফীপন্থীদের নজরে হাটহাজারী মাদ্রাসা, কমিটি করতে ‘সরকারের’ সবুজ সংকেত

 

নজর২৪ ডেস্ক- ধর্মভিক্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি গঠনের আগে ‘উম্মুল মাদারিস’ হিসেবে পরিচিত দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠানটিতে পুরনো প্রভাব ফেরানোর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন আল্লামা আহমদ শফীর অনুসারী আলেমরা।

 

হেফাজতের নতুন কমিটি গঠনের আগে সারা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই কওমি মাদ্রাসায় আহমদ শফীর সন্তান মাওলানা আনাস মাদানীকে পুনর্বহাল এবং নতুন পরিচালক নির্বাচনের দিকে মনোযোগ তাদের।

 

আল্লামা আহমদ শফীপন্থী প্রভাবশালী আলেম ও হেফাজতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানা গেছে।

 

শফীপন্থী প্রভাবশালী ও হেফাজতের তিন জন উদ্যোক্তা-আলেম জানিয়েছেন, মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের কমিটির বাইরে নতুন কমিটি করতে সরকারের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছেন আল্লামা শফীপন্থী আলেমরা।

 

এই অংশের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাওলানা আনাস মাদানী রমজানের শেষ সপ্তাহে দুবাই থেকে ফিরে আসার পর আরও আলেমসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও সরকারের পদস্থ একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব সাক্ষাতে সরকারের পক্ষ থেকে হেফাজতের নতুন কমিটি করতে সম্মতি মিলেছে।

 

এ বিষয়ে শুক্রবার (২১ মে) বিকালে মাওলানা আনাস মাদানী জানান, তিনি এখনই কোনও মন্তব্য করতে আগ্রহী নন। আর মুফতি ফয়জুল্লাহ জানিয়েছেন, তাদের উদ্যোগ চলমান রয়েছে। সময় হলেই তা সামনে আসবে।

 

আল্লামা শফীপন্থীদের নজরে হাটহাজারী মাদ্রাসা

 

আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর ঘটনায় হেফাজতের আহ্বায়ক জুনায়েদ বাবুনগরীসহ ৪৩ জন আলেমের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত ১২ এপ্রিল চট্টগ্রাম আদালতে এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।

 

শফীপন্থী আলেমরা বলছেন, আল্লামা শফীর মৃত্যুর ঘটনায় বাবুনগরীর নাম আসায় হাটহাজারী মাদ্রাসায় তার অবস্থানের পরিবর্তন আসবে। আর এই পরিবর্তনের জন্য শফীপন্থী আলেমদের সঙ্গে সরকারের মতের মিল রয়েছে। সেক্ষেত্রে আগামী জুনে মাদ্রাসা পরিচালনায় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

 

আল্লামা আহমদ শফীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত বছরের জুলাইয়ে দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি পরিবর্তন আসে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—সহকারী শিক্ষা সচিবের পদ থেকে আনাস মাদানীকে অপসারণ, আল্লামা আহমদ শফী অক্ষম হওয়ায় মহাপরিচালকের পদ থেকে সম্মানজনকভাবে অব্যাহতি দিয়ে উপদেষ্টা বানানো।

 

ছাত্র বিক্ষোভের চাপে পড়ে ওই সময় মাওলানা শেখ আহমদ, মুফতি আব্দুস ছালাম ও মাওলানা ইয়াহিয়াকে আগামী ছয় মাসের জন্য মাদ্রাসা পরিচালনায় অন্তর্বর্তীকালীন নিয়োগ দেয় শুরা কমিটি। আর মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে শায়খুল হাদিস ও শিক্ষা পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

 

শফীপন্থী প্রভাবশালী একজন আলেম বলেন, আইনগত কারণেই বাবুনগরী হাটহাজারী মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ হারাবেন। এখন তিন জনের নেতৃত্বে মাদ্রাসা পরিচালনা করা হলেও পরিচালক হিসেবে দুজনের নাম আলোচনায় আছে।

 

একজন আবদুস সালাম চাটগামী, যিনি পাকিস্তানের করাচিতে পড়াশোনা করেছেন এবং সেই দেশের একটি মাদ্রাসায় চাকরিও করেছেন। আরেকজন দিদার আহমেদ কাসেমী, যিনি ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করেছেন। এই দুজনের মধ্যে একজনকে কেন্দ্রে রেখে চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে।

 

উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত একজন আলেম বলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসার নেতৃত্বে পরিবর্তন না এলে আনাস মাদানী সেখানে যেতে পারবেন না। আর হেফাজত মানেই হাটহাজারী মাদ্রাসা, সেক্ষেত্রে আগে হাটহাজারী মাদ্রাসার বিষয়টি ঠিক হলেই নতুন হেফাজতের বিষয়টি সামনে আসবে। হেফাজতের যে নেতৃত্ব শূন্যতা, তাও কেটে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *