অনুতপ্ত নয় মুন্না ভগত: উল্টো বলল, মৃত নারীদের ধর্ষণ দোষের কিছু না

নজর২৪ ডেস্ক- রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে কিশোরীদের মৃতদেহ সম্ভোগের প্রমাণ পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সারা দেশের মর্গগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

 

সিআইডি বলছে, গত বছরের ২৯ মার্চ থেকে চলতি বছরের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত পাঁচ কিশোরীর মৃতদেহ সম্ভোগ করা হয়েছে বলে তারা প্রমাণ পেয়েছেন। তাদের বয়স ছিল ১১ থেকে ১৭ বছর। নজিরবিহীন এ অপরাধ করেন ডোমের সহযোগী মুন্না ভগত (২০)। তাকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। শুক্রবার ঘটনাটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছে তারা।

 

মুন্নার বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের জুরান মোল্লার পাড়ায়। তিনি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের কোনো কর্মচারী নন। হাসপাতালের ডোম যতন কুমারের ভাগ্নে হওয়ার সুবাদে মুন্না সেখানে কাজ করেন। রাতের বেলাও তিনি ওখানেই থাকতেন।

 

এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যায় মুন্না ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জবানবন্দিতে অস্বাভাবিক অপকর্মের কথা স্বীকার করলেও তিনি কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত নন বলে জানান। তার ভাষায়, ‘মৃত মানুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক দোষের কিছু না। ’

 

তবে সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মুন্না যে অপরাধ করেছেন, সেজন্য তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

 

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবের বিশ্লেষকরা ‘কোডেক্স’ নামে সফটওয়্যারে ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখতে পায় ৫টি মৃতদেহে একই ব্যক্তির ডিএনএ। পাঁচ ভিক্টিমই কিশোরী। তাদের বয়স যথাক্রমে- ১১, ১৩, ১৪, ১৬ এবং ১৭ বছর। সবগুলোই ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা। ৫টি আত্মহত্যার মধ্যে ৪টি মিরপুর এবং ১টি ঘটেছে মোহাম্মদপুর এলাকায়। ২টি ঘটেছে ২০১৯ সালের মার্চ ও অক্টোবর মাসে। বাকি তিনটির একটি এ বছরের মার্চ ও ২টি আগস্ট মাসে ঘটেছে। সময়, এলাকা, বয়স ও লিঙ্গ একই ধরনের হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে সিআইডির ধারণা হয় ভিক্টিমরা কোনও সিরিয়াল কিলারের শিকার।

 

২০১৫ সালে হাইকোর্ট এক আদিবাসী নারীর অপমৃত্যু মামলার রায়ে এক ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। তাতে বলা হয়, কোনো নারীর অপমৃত্যু হলে, তাদের যৌনাঙ্গ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। দেখতে হবে অপমৃত্যুর আগে কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিনা। তারপর থেকে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব আদালতের নির্দেশ মেনে আসছে।

 

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, শিগগিরই ওই সিরিয়াল কিলার আরও হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে এমন আশঙ্কা নিয়ে তদন্তে নামেন তারা। তারা মোহোম্মদপুর ও কাফরুল থানায় হওয়া ৫টি অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাথে কথা বলেন। তাতে তারা জানতে পারেন, ৫টি মামলার ভিক্টিমের সুরতহালে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তির আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে প্রতিটি ঘটনাকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে।

 

এছাড়া, প্রত্যেক ভিক্টিম দরজা লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ৩টি ঘটনায় স্বজনদের খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। সব মিলিয়ে সিআইডির কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তে আসেন তাদের প্রাথমিক ধারণা ভুল। এরপরই ওই অভিনয়ের আশ্রয় নেয় সিআইডি।

 

অনুসন্ধানে নেমে সিআইডি জানতে পারে, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গের মূল ডোম রজত কুমার। তাকে সহায়তা করে আরও ৫/৬ জন। তার মধ্যে রজতের ভাগ্নে মুন্না ভগত রাতে মর্গের পাশেই একটি কক্ষে থাকে। মুন্নাকেই সন্দেহ হয় সিআইডির। গুমের শিকার হওয়া এক যুবকের স্বজন সেজে মুন্নার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন সিআইডির দুই কর্মকর্তা।

 

তাদের একজন জানান, বেশ কয়েকদিন লাগাতার তারা মুন্নাকে ফলো করতে থাকেন। রাতে মুন্নাই থাকে এটি নিশ্চিত হতে তারা রাত ১টা বা ২টায়ও মর্গে গিয়েছেন। ছবি দেখিয়ে জানতে চেয়েছেন এই চেহারার কোনো লাশ মর্গে এসেছে কিনা। সম্পর্ক গাঢ় হলে, কৌশলে মুন্নার পান করা সিগারেটের ফিল্টার সংগ্রহ করেন তারা। ফিল্টার থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ’র সাথে মিলে যায় ওই পাঁচ কিশোরীর দেহে পাওয়া ডিএনএ’র।

 

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম ধরা পড়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে একটি হাসপাতাল মর্গের ঘটনা ধরা পড়েছে। সারা দেশের অন্য হাসপাতালগুলোতেও অনেক ডোম কাজ করেন। তারা যে এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে না সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। খুঁজলে আরো অনেক পাওয়া যেতে পারে। তাই অন্যান্য হাসপাতালে সিআইডির নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *