নজর২৪ ডেস্ক: সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার ১ নম্বর কায়েমপুর ইউনিয়নের বলদীপাড়া-হলদীঘর গ্রামের শতবর্ষীয় ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠে আশ্রয়ণ প্রকল্প না করার অনুরোধ জানিয়ে ২১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২২ আগস্ট) বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের পক্ষ থেকে গ্রিন ভয়েসের সমন্বয়কারী আলমগীর কবীরের সই করা বিবৃতিতে এ অনুরোধ জানানো হয়।
বিবৃতি দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী ও বাপার সভাপতি সুলতানা কামাল ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বিবৃতিতে তারা ওই অনুরোধের পাশাপাশি রোববার (২১ আগষ্ট) প্রশাসনের উপস্থিতিতে সহিংসতা, দুস্কৃতিকারীদের দ্বারা স্থানীয় জনগণের হয়রানি ও আহত হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া, স্থানীয় এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতারকৃত নারীদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, খেলার মাঠটিতে দীর্ঘদিন ধরে শাহজাদপুর উপজেলার ১ নম্বর কায়েমপুর ইউনিয়নের ৫-৬টি গ্রামের শিশু-কিশোর ও যুবকরা খেলাধুলা করে আসছে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজনও এ মাঠে করা হয়ে থাকে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু-কিশোরদের জন্য একমাত্র খেলার মাঠ হিসেবে এ মাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।
‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও স্থানীয় জনগণের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, সরকার খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত উক্ত স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। খেলার মাঠে আশ্রয়ণ প্রকল্প করার বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় এলাকাবাসী তা বন্ধের দাবিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করেন।’
বিবৃতিতে বলা হয়, এলাকাবাসী গত শনিবার (২০ আগষ্ট) প্রাণপ্রিয় খেলার মাঠটি রক্ষায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানান। জনগণের এ দাবিকে উপেক্ষা করে আশ্রায়ণ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রোববার (২১ আগষ্ট) আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীন স্থাপনা নির্মাণের জন্য নির্মাণ সরঞ্জামসহ মাঠ দখলের চেষ্টা করে। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দেন।
‘এলাকাবাসীর প্রাণপ্রিয় মাঠ রক্ষার যৌক্তিক দাবিতে বাধ সাধে প্রশাসন ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় থাকা কতিপয় দুস্কৃতিকারী ব্যক্তি। যারা নারী, শিশু-কিশোর ও সাধারণ জনগণের ওপর হামলা চালান। ওই হামলায় অন্তত ৫-৭ জন নারী, শিশু-কিশোর, সাধারণ জনগণসহ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা আহত হন।’
বিবৃতিদাতারা বলেন, এ হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫ম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বাদী হয়ে শাহজাদপুর থানায় ৫৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ১০০-১২০ জনের বিরুদ্ধে একটি হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় সাত নারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আমরা প্রশাসনের সামনে ও তাদের সমর্থনে ঘটে যাওয়া এমন সহিংস হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে বলা হয়, আশ্রয়ণ প্রকল্প বর্তমান সরকারের একটি মহৎ উদ্যোগ। এ উদ্যোগকে আমরা আন্তরিকভাবে সমর্থন ও সাধুবাদ জানাই। আমরা কোনোভাবেই সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিরোধী নই। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য প্রায়ই খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত স্থানকে বেছে নেওয়া হচ্ছে। যার ফলে সাধারণ জনগণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
‘বারবার এমন ঘটনার পূনরাবৃত্তি রোধ করতে আমরা আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য সর্ব সাধারণের ব্যবহার্য নয় এমন স্থান নির্বাচনের প্রস্তাব করছি। বিদ্যমান পতিত অকৃষি শ্রেণির কোনো খাস জমিই হতে পারে এ প্রকল্প নির্মাণের একমাত্র উপযুক্ত স্থান।’
বিবৃতিদাতারা বলেন, উপরোক্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলদীপাড়া-হলদীঘর গ্রামের শতবর্ষীয় ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠে আশ্রয়ণ প্রকল্প না করার অনুরোধ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে, উল্লেখিত মাঠটির যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জনদাবির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছি।
বিবৃতি দাতাদের মধ্যে আরও রয়েছেন- এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, নারীপক্ষের সদস্য শিরিন হক, সেন্ট্রাল উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক পারভীন হাসান, ব্লাস্টের অনারারি ডিরেক্টর ব্যারিস্টার সারা হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, কোস্টের প্রধান নির্বাহী রেজাউল করিম চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী মো. নূর খান লিটন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সহ-সাধারণ সম্পাদক সংগীতা ইমাম, বহ্নিশিখার প্রতিষ্ঠাতা তাসাফি হোসেন, বাপার যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব, সঙ্গীতশিল্পী ও লেখক অরূপ রাহী, উন্নয়নকর্মী ও গায়ক নবনীতা চৌধুরী, সাংবাদিক ড. সায়দিয়া গুলরুখ, গ্রিন ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা আহসান রনি।
