মীরসরাইয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঝর্ণাগুলোতে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল, ৩ বছরে ১৬ পর্যটকের মৃত্যু

রাজিব মজুমদার, মীরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের খৈয়াছড়া, নাপিত্তা ছরা, মহামায়া বুনো ঝর্ণাগুলো দেখতে আসে দূরদুরান্তের পর্যটকরা। এসব ঝর্ণায় শক্ত পাথরের মতো পাহাড়ের শরীর লেপটে টলমলে স্বচ্ছ পানির ধারা গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে গিয়ে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছে পর্যটকরা। বর্ষায় অসর্তকতার কারণে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।

এখানকার অব্যবস্থাপনা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রকৃতি প্রেমিরা যেন জীবনের ঝুঁকিটাই নিয়ে ফেলেন। নানা প্রতিকূলতা ও অব্যবস্থাপনায় পড়ে গত ৩ বছরে এসব ঝর্ণায় ১৬ পর্যটক প্রাণ হারায়। তবুও টনক নড়েনি প্রশাসন কিংবা ইজারাদার কর্তৃপক্ষের।

স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে এখানকার পাহাড়ি মাটি ও শ্যাওলাযুক্ত পাথরগুলো অনেক বেশি পিচ্ছিল হয়ে যায়। তবে বর্ষায় জলের স্তর অনেক বেড়ে যায় বলে ঝর্ণাগুলো দেখতে ভারী সুন্দর দেখায়। মূল ঝর্ণাস্থলে যাওয়ার রাস্তা অধিকাংশই ঝিরি পথ। তাই অনেক সময় ঝর্ণায় পৌঁছানোর ঝিরি পথ হাঁটু সমান পানিতে ডুবে থাকে। আবার ভারী বর্ষণে পানি বেড়ে কোমর পরিমান হয়ে যায়। পথগুলো হয়ে যায় পর্যটক চলাচলে কণ্টকাকীর্ণ।

এছাড়া ঝর্ণার দৃশ্য দেখতে চূড়ায় উঠার সময় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি লোকেশনে নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নেই পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা, গাইড দ্বারা নিয়ন্ত্রণ, নেই নির্দেশনা সতর্কীকরণ। ফলে এসব ঝুঁকিপূর্ণ পথে দর্শণার্থী আগন্তুকদের অসতর্কতার জন্য প্রতিবছর ৫-৭ জন পর্যটক প্রাণ হারায়, আহত হয় অর্ধশতাধিক।

সর্বশেষ গত ১৯ জুন নাপিত্তাছরা ঝর্ণা দেখতে গিয়ে নিখোঁজ হন চট্টগ্রামের শিক্ষার্থী দুই সহোদরসহ তিন বন্ধু। ঐদিন সন্ধ্যায় ইশতিয়াকুর রহমান প্রান্তের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর পরদিন বিকালে খৈয়াছরা ইউনিয়নের নাপিত্তাছরা ঝর্ণা এলাকার খাল থেকে মাসুদ আহম্মেদ তানভীরের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। নিখোঁজ হওয়ার ৪০ ঘণ্টা পর ২১ জুন সকালে উদ্ধার করা হয় আরেক পর্যটক তৌফিক আহম্মেদ তারেকের লাশ। গত তিন বছরে এভাবে ১৬ জন পর্যটক ঝর্ণায় পড়ে নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে চলতি বছর প্রায় ২৮ লাখ টাকায় টিএস আর ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ঝর্ণাগুলো ইজারা দেয়া হয়।
জন প্রতি পর্যটকের কাছ নেয়া হয় ২০ টাকা। ইজারা দেওয়া হলেও বন বিভাগ ও ইজাদারের উদাসিনতায় এমন দূর্ঘটনা ঘটছে বলে দাবি
করেন স্থানীয়রা। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমানের দাবি আগামীতে ঝর্ণাগুলো ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের সমন্বয়ে ইজারা দেয়ার জন্য যথাযথ কতৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখবেন তিনি।

সূত্র জানায়, ঝর্ণা দেখতে এসে গত কয়েক বছরে কমপক্ষে ১৬ জন পর্যটক নিহত হয়েছে। ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ফেনী থেকে
আসা ফয়েজ আহম্মদ নামে এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে নিহত হয়। এসময় আহত হয়েছে কমপক্ষে ৪ জন। একই বছরের ২৯ আগস্ট দেলোয়ার হোসেন নামে চট্টগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়।

১৫ আগষ্ট চট্টগ্রাম থেকে আসা মেহেদী হাসান (২২) নামে একজন প্রকৌশল ছাত্রের রুপসী ঝর্ণায় নির্মম ভাবে মৃত্যু হয়। একই বছরের ২৬ জুলাই ঢাকা থেকে আসা প্রকৌশলী আবু আলী আল হোসাই মেমোরী (৩০ ) নামের প্রকৌশলী খৈয়াছরা ঝর্ণায় অসতর্কভাবে ছবি তুলতে গিয়ে পিছলে পড়ে মৃত্যু ঘটনা ঘটে।

ওই বছরের ১২ জুলাই বোয়ালিয়া ঝর্ণা দেখতে আসা ১৫ ছাত্রছাত্রী অসতর্কতার জন্য ঝর্ণার পথে ছরায় পানি বেড়ে যাওয়ায় আটকা
পড়ে। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। চলতি বছরের ১৯ জুন নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা এলাকা থেকে চট্টগ্রাম থেকে
আসা ইশতিয়াক (২২) নামে এক পর্যটকের লাশ উদ্ধার করে মীরসরাই থানা পুলিশ। সর্বশেষ গত ২১ জুন সকালে তৌফিক আহম্মেদ
তারেক নামে এক পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করে ডুবুরী দল। একসাথে বেড়াতে আসা তারেক তানভীর এই দুই সহোদরসহ আরেক বন্ধু
ইশতিয়াকের তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে খৈয়াছড়া ইউনিয়নের নাপিত্তাছরা ঝর্ণার দায়িত্বে থাকা বারইয়াঢালা রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম আলতাফ হোসেন বলেন, পর্যটকদের টিকেট দেয়ার সময় বিপদজ্জনক স্থানগুলোতে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু পর্যটকরা নিদের্শনা নির্দেশনা মানছেন না। ফলে ঘটছে দূর্ঘটনা।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে মীরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান বলেন, ঝর্ণাগুলো ইজারা দেয়া হলেও পর্যটকদের নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা রাখেনি ইজাদার ও বন বিভাগ। তাই আগামীতে ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের সমন্বয়ে ঝর্ণাগুলো ইজারা দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেয়া হবে। এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *