রাজবাড়ীর নদী চর ঘিরে অবাধে চলছে পাখি শিকার

রাকিবুল ইসলাম রাফি, রাজবাড়ী প্রতিনিধি: দেশের বৃহৎ নদী পদ্মা। আর পদ্মাকন্যা খ্যাত রাজবাড়ীতে চলছে নির্বিচারে পরিযায়ী পাখি নিধন। বিভিন্ন ধরনের জাল, বিষটোপ, এয়ারগান ও বন্দুক দিয়ে চোরাশিকারিরা এসব পাখি হত্যা করছে।

 

বনবিভাগ বলছে, পাখি শিকার কমাতে তারা ইতোমধ্যে সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি চালিয়েছেন। যদিও জনবলের অভাবে তারা পাখি নিধন বন্ধ করতে পারছেন না; বরং পাখি শিকারে ব্যবহৃত হচ্ছে নিত্য নতুন কৌশল।

 

রাজবাড়ীর জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে চারটি উপজলার মধ্য দিয়ে পদ্মা নদী প্রবাহিত হয়েছে। অপরটির কোল ঘেষে গড়াই। নদীতে এ মৌসুমে পানি শুকিয়ে আসায় ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখি এসে ভিড় জমায়।

 

সরেজমিনে জানা যায়, গোয়ালন্দ বাজার, রাজবাড়ী, পাংশা, কালুখালি ও বালিয়াকান্দির জামালপুর বাজারে সবচেয়ে বেশি পাখি কেনাবেচা হচ্ছে। এখানে শিকার ও বিক্রি করতে আসা পেশাদার শিকারীরা বেশির ভাগই পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার। আর এব্যাপারে এসব এলাকাতে প্রশাসনের কোনো লোকজনও সেভাবে নজরদারি করেনা। ফলে এই এলাকাতে শিকারিদের আনাগোনাও বেশি।

 

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুরের চর বাসিন্দারা জানান, অল্প পানিতে খাবার সংগ্রহের জন্য দেশি ও অতিথি পাখি আসতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে প্রচুর মাছও দেখা যাচ্ছে। ফলে ঝাঁকে ঝাঁকে চখাচখি, পানকৌড়ি, বক, হরিয়াল, হারগিলা, রাতচোরা, বালিহাঁস, ইটালী, শর্লি, পিঁয়াজ খেকো, ত্রিশূল, বাটুইলা, নারুলিয়া, লালস্বর, কাঁদোখোচা, ফেফি, ডাহুক, গোয়াল, শামুখখোল, হটটিটি, ঘুঘুসহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি বসতে শুরু করেছে। আর এ সুযোগে এক শ্রেণির শৌখিন ও পেশাদার পাখি শিকারি বন্দুক, বিষটোপ, কারেন্ট জাল ও ফাঁদ পেতে প্রতিনিয়ত পাখি শিকার করছে। প্রকাশ্যে এসব পাখি বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।

 

রাজবাড়ীতে পাখি বিক্রি করতে আসা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাবনার কাশিনাথপুর উপজেলার একজন পেশাদার পাখি শিকারি বলেন, বাজারে পাখির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই কোনো মতে ধরতে পারলেই বিক্রি করতে সমস্যা হয় না। প্রতি জোড়া পাখি প্রজাতি ভেদে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। ফলে বেশি লাভের আসায় অনেকেই মাছ ধরা বাদ দিয়ে পাখি শিকার করছেন। আমাদের এলাকার অনেকেই এখন এই পেশায় যুক্ত হয়েছে।

 

স্থানীয়রা বলছেন, ছোট-বড় ৬টি নদী ও ১৪৮টি বিল নিয়ে গঠিত রাজবাড়ী। নদী ও বিলে পানি শুকিয়ে আসতে থাকলে বিভিন্ন মাছ শিকারী পাখি এবং শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে অতিথি পাখির আগমন বাড়তে থাকে। আর একই সঙ্গে তৎপর হয়ে ওঠে পাখি শিকারিরা। রাতের আঁধারে তারা বিভিন্ন জাল এবং বিষটোপ দিয়ে পাখি শিকার করে। ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা পালিয়ে যায়। অনেক সময় সাধারণ মানুষ বুঝতে পারলেও প্রভাবশালী শিকারিদের বাধা দিতে বা চ্যালেঞ্জ করতে তারা ভয় পান।

 

কয়েকজন স্থানীয় চিকিৎসকের সাথে কথা হলে তারা জানান, এসব পরিযায়ী পাখি বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের দেশে আসার কারণে এরা সুয়াইনফ্লুসহ বিভিন্ন রোগের জীবাণু বহন করতে পারে। এই পাখি খেলে এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে।

 

এ প্রসঙ্গে রাজবাড়ী বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাবিবুজ্জামান বলেন, পাখি শিকার জীববৈচিত্রের জন্য খুবই ক্ষতিকর এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। শুধু পাখি নয়, বন্য প্রাণী রক্ষায় যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। তা না হলে আগামী প্রজন্মকে কাগজে কলমে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্য প্রাণীর নাম জানতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *